লোভ-লালসা মানুষের সব দুর্নীতি ও অপকর্মের মূল

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
লোভ-লালসা মানুষের অন্তরের মারাত্মক ব্যাধি। লোভ-লালসা মানুষের সব দুর্নীতি ও অপকর্মের মূল। এটি মানুষের একটি অত্যান্ত মন্দ স্বভাব। সুতরাং এর প্রয়োগ, ব্যবহারও অন্যায়। মন্দ হিসেবে যার পরিচিতি, মানুষের তা অনুসরণ করা অন্যায়। এর মূল উদগাতা হিসেবে যার ভূমিকা সদা সক্রিয়, সে আল্লাহদ্রোহি এবং সমগ্রমানব জাতির শক্র, অভিশপ্ত শয়তান। তার স্বভাব-চরিত্রের অংশ লোভ-লালসা। সুকৌশলে, সুশোভিত এবং অতি সৌন্দর্যমন্ডিত করে মানুষ দ্বারা এ কাজ করাতে তার জুড়ি নেই। মানুষকে নানা লোভ দেখিয়ে অন্যায় পথে পরিচালিত করা, অভাবের ভয় দেখিয়ে গর্হিত কাজে লিপ্ত করা, ধন-দৌলতের প্রতি প্রলুব্ধ করে অন্যায়ভাবে সম্পদের পাহাড় গড়তে উদ্বুদ্ধ করা, মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কলাকৌশল শেখানো, অন্যায়ভাবে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ, খুন-খারাবি, জোরপূর্বক অন্যের সম্পত্তি দখল, জালিয়াতি, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা ইত্যাদি হেন অপকর্ম নেই যা শয়তানের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। এ সবই লোভ-লালসার অনিবার্য পরিণতি। লোভ-লালসা, নফসের কামনা-বাসনা এবং আরাম-আয়েশ শুরু করবে এবং সত্যের পথ থেকে দূরে সরে যাবে, তখন তার ওপর শয়তান প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। শয়তানের উৎসাহ-প্রেরণাগুলোকে বলা হয় ‘ওয়াসাভেস’ বা প্ররোচণাসূমহ।
একে অন্যের থেকে বেশি পাওয়ার লোভ। লোভের কারণেই আমরা ভুলে যাই ক্ষণস্থায়ী জীবনের কথা। ছোট্ট এক জীবনে কতো টাকা, কতো ক্ষমতা, কতো সম্মান ও প্রতিপত্তি প্রয়োজন? এতো লোভ, এতো অহঙ্কার কেনো? মাটির পিঠ থেকে পেটে চলে গেলে এসব কী কাজে আসবে? এতে না পাওয়া যায় দুনিয়ার সুখ-শান্তি এবং আখিরাতের জন্য হয় গোনাহের বোঝা ভারী। দিন যাচ্ছে, বয়স ফুরাচ্ছে, অথচ লোভাতুর হয়েই মানুষ কবর পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। ‘একে অন্যের থেকে বেশি পাওয়ার লোভ বা প্রতিযোগিতা তোমাদের ভুলের মধ্যে ফেলে রেখেছে। এমনকি দুনিয়া পাওয়ার এ চিন্তা নিয়েই তোমরা কবরে পৌঁছে যাও।’ (সূরা তাকাসুর-১ ও ২)
আরবিতে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে- ‘আল-ইনসানু হারিছুন ফিমা মুনিয়া’, ‘‘নিষিদ্ধ বস্তু বা দ্রব্য মধুর’’ অর্থাৎ নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষ লালায়িত থাকে। সম্পদের আকাক্সক্ষা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। মানুষ শয়তানের ফাঁদে এমনভাবে পড়ে যায় যে, চিন্তা-ভাবনার শক্তিই সে হারিয়ে ফেলে। ফলে শয়তান-প্ররোচিত লোভ-লালসার শিকার হয়ে কখনো কখনো মহাক্ষতিরও সম্মুখীন হতে হয়।লোভ বেশি হলে ক্ষতিও বেশি হয়। ‘লোভে পাপ পাপে মৃত্যু, প্রবাদ সত্যে পরিণত হওয়ার ভুরিভুরি দৃষ্টান্ত রয়েছে। কুখ্যাত ‘কারুনের’ করুণ পরিণতির পেছনে অর্থ-সম্পদ রক্ষার লোভ ছিলো প্রধান। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে সে জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো।
অতি লোভে সব হারায়। লোভের ইয়াত্তা নেই। মানুষের মন্দ স্বভাব চরিত্রগুলোর মধ্যে ‘হিরছ’ অর্থাৎ (লোভ-লালসা) অন্যতম। হিরছ এ দুটি শব্দের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িতো। এগুলো প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র বিষয়,মানব সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন ও ব্যবহার পরিলক্ষিত হলেও এর ধ্বংসাত্মক দিকও বিশেষ গুরুত্ববহ।
আমরা যে দুর্যোগে পতিত হই তার সব কিছুই লোভের ফসল। মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রভৃতি এমনকি সর্বক্ষেত্রে লোভ-লালসার ছড়াছড়ি এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, এর গতি-প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার অবকাশ কারো নেই। হাজারো কিসিমের অন্যায় ও পাপাচারের উৎস রূপে লোভ-লালসা মানুষকে যে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে, তা বিচার-বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। লোভ একজনকে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
দুনিয়ার সেই ব্যক্তি মাল সঞ্চয় করে যার আকল বা বুদ্ধি নেই। দুনিয়াতে যার সম্পদ কম তার আখিরাতে হিসাব সহজ হবে। হাদিসে আছে, ‘‘ধনী হওয়া ধনের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে মনে তৃপ্তির ওপর’’। সীমাহীন লোভ-লালসা মানুষকে তার সামর্থ্যরে বাইরে ঠেলে দেয়। তার বিবেক-বুদ্ধি লোপ করে তাকে দুর্নীতি ও পাপের পথে পরিচালিত করে।লোভ-লালসার কবলে পড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা অগণিত লোভ লালসা যার সাহায্যে সৃষ্টি হয় অন্যায় ও অবৈধ কাজের বিভিন্ন রাস্তা। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষই প্রবৃত্তির এই অদৃশ্য শক্তিশালী চাহিদার শিকার হয়। লোভ মানুষের পারিবারিক জীবনে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সৃষ্টি করে নানা সমস্যা এবং নিরাপত্তাহীন অশান্তির অস্বস্তিকর পরিবেশ। এমনকি আপন সহোদরের মাঝে ধন-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ, ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট, আত্মীয়-স্বজনের সম্পর্কে বিচ্ছেদ এবং পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে মামলা-মোকাদ্দমা এবং দুর্নীতিতে জড়িত হওয়ায় ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করে- সর্বনাশী লোভ।
রাসূল (সা.) বলেছেন : ‘জগতে এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার ওপর কোনো না কোনো সময় শয়তানের প্রভাব পাওয়া যায়নি এবং তাকে বিপদগামী করেনি। কিন্তু উমর (রা.) ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি শয়তানের ওপর পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।
সূরা তাওবায় আল্লাহ তা’য়ালা বলেন : ‘হে মোমেনগণ! পন্ডিত এবং সংসার বিরাগীদের মধ্যে অনেকেই লোকের ধন অন্যায়ভাবে ভোগ করে থাকে এবং লোককে আল্লাহর পথ থেকে নিবৃত করে। আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও।’
লোভ-লালসা হচ্ছে মানুষের চরিত্রের দুর্বলতম ও হীনতম বৈশিষ্ট্যের একটি। লোভ-লালসার প্রকৃতিতে আত্মসমর্পণ করে অন্যায়ভাবে অপরের ধন-সম্পত্তি আত্মসাৎ করায় এবং মানুষের মান-সম্মান ধূলিসাৎ, এমনকি অন্যদেরকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না। পার্থিব জীবনে স্বাবলম্বীর প্রত্যাশায় ও প্রচেষ্টায় অবৈধভাবে ধন-সম্পত্তি উপার্জনের আসক্তিতে মানুষ পারলৌকিক জীবন ভুলে যায়। প্রচুর পরিমাণে ধন-সম্পত্তি থাকলেও তার কোনো তৃপ্তি নেই সে আরও বেশি চায়। বেশি লাভের লক্ষে লক্ষ্মী হারায়। লোভ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কোনো মানুষের এক উপত্যকা ভরা স্বর্ণ থাকে, তবে সে তার জন্য দু’টি উপত্যকা (ভর্তি স্বর্ণ) হওয়ার আকাক্সক্ষা করে। তার মুখ মাটি ছাড়া (মৃত্যু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত) আর কিছুতেই ভরে না। আর যে ব্যক্তি তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।’ -(সহিহ বোখারি)
হাদিসে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন, ‘‘তোমার মাল তো উহাই যা তুমি খেয়ে শেষ করেছো, যা তুমি পরিধান করে শেষ করেছো, আর যা তুমি দান সদকা করে সঞ্চয় করেছো।’’ ম’ুমিন বান্দারা যেসব নেয়ামত আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন সেগুলোর জন্য সর্বদা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে ও তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। আর যদি পরবর্তীতে কিছু তার সম্পদ বৃদ্ধি পায় তার জন্যও সে আল্লাহর দরবারে পূর্বাপেক্ষা অধিক কৃতজ্ঞতা আদায় করে। সে ভুলেও অন্যের সম্পদের প্রতি দৃষ্টি দেয় না। মু’মিনদের এ দলটি সর্বদাই সুখে ও শান্তিতে বসবাস করে। কেননা তারা আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য বৈ অন্য কিছু চায় না। লোভ, হিংসা, অহংকার বহু পাপের জন্ম দেয়। প্রবাদে আছে,অতি বাড় বেড় না, ঝড়ে পড়ে যাবে। লোভ পরিত্যাগ করে একজন আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য ইসলাম তথা পবিত্র কোরআন-হাদিসে বিভিন্ন ভঙ্গিতে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষাই হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার ভয়, আদর্শের অনুশীলন, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন, আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও বিবেকের শিক্ষাকে রপ্ত করার অভ্যাস সৃষ্টি করতে হবে। তা নাহলে ধ্বংস অনিবার্য।
লোভ-লালসা মানুষের দ্বীন ও ঈমানের জন্য মারাত্মক হুকমি। বিষয়টি নবী করিম (সা.) একটি উপমা দ্বারা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন ‘দুইটি ক্ষুধার্ত বাঘ মেষপালে ছেড়ে দিলে যে পরিমাণ ক্ষতি সাধন করতে পারে, সম্পদ কিংবা পদমর্যাদার মোহ মানুষের দ্বীনের জন্য এর চেয়ে ক্ষতিসাধন করে।’(সুনানে তিরমিজি)
লোভ মানুষের অধঃপতনের অন্যতম কারণ। লোভ একটি নৈতিক ক্রুটি। লোভ মানুষের জীবন থেকে সুখ কেড়ে নেয়। লোভী মানুষ আল্লাহ তা’য়ালার কোনো নিয়ামতের শোকরিয়া আদায় করে না, বরং আল্লাহ তাকে যা দান করেছেন তার চেয়ে সে আরও অনেক বেশি কিছু চায়। লোভের উৎপত্তি হিসেবে বলা হয়েছে- ভয়, কৃপণতা ও লোভ একই প্রকারের। আর তাদের মূল হলো- খারাপ ধারণা পোষণ করা। ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, কৃপণ ব্যক্তিরা সর্বদা বঞ্চিত হয় এবং তারা কোনো কাজেই সফল হয় না। কেননা তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে না বরং নিজের লালসা মেটানোর জন্য কাজ করে। লোভী মানুষ দু’টি উৎকৃষ্ট গুণ হতে বঞ্চিত। ফলশ্রুতিতে সে দু’টি দোষের অধিকারী।এক. সে জীবনে পরিতৃপ্ত হওয়া থেকে বঞ্চিত, ফলে সে জীবন থেকে প্রশান্তিকে হাতছাড়া করেছে। দুই. লোভী যেহেতু সন্তুষ্টি হতে বঞ্চিত, ফলে সে অপরের বিশ্বাসকে খুইয়েছে।
লোভাতুর দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির জীবনে কখনো শান্তি আসতে পারে না। বেশিরভাগ সামাজিক অনাচারের পেছনে লোভ-লালসার বিরাট প্রভাব রয়েছে। নবী করীম (সা.) লোভ-লালসাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে করেছেন, ‘তোমরা লোভ-লালসা থেকে বেঁচে থাকো, কেননা এ জিনিসই তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করেছে এবং পরস্পরকে রক্তপাত ঘটানোর ব্যাপারে উসকে দিয়েছে। লোভ-লালসার কারণেই তারা হারামকে হালাল সাব্যস্ত করেছে।’ (সহিহ মুসলিম) যদি বৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের পরও মানুষের মনে তৃপ্তি না আসে, তাহলে বুঝতে হবে তার মনে লোভ বাসা বেঁধেছে। লোভী ব্যক্তি নিজের অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। হাতে যা আছে তাতে সুখী না থেকে অন্যায়ভাবে আরো বেশি কিছু পাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। অতিরিক্ত কিছু পাওয়ার আকাক্সক্ষা ও অন্যের বস্তু আত্মসাৎ করার প্রবণতা ইসলামসম্মত নয়। লোভের বশবর্তী হয়ে কিছু মানুষ ধর্ম-কর্ম ভুলে নিজের জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনে। লোভ-লালসা মানুষকে অন্ধ করে তার বিবেকবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে তাকে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় এবং ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্য বিচারের ক্ষমতা নির্মূল করে ফেলে। তাই লোভ মানুষের চরম শত্রু, জীবনের বিনাশ সাধনই এর কাজ। লোভ-লালসা নিয়ন্ত্রণ ও দমন করতেই হবে, নইলে মানুষের নৈতিকতার বিকাশ, সৎ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপন করা সম্ভব হবে না। দুর্নীতিবাজ লোভাতুর ব্যক্তি কখনো পরোপকার ও জনকল্যাণকর কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয় না। লোভ-লালসা বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন অর্থসম্পদ, মানসম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, প্রসিদ্ধি ও সুখ্যাতি লাভের প্রবল লোভ মানব চরিত্র গঠন ও সংশোধনের পথে বিরাট অন্তরায়। এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যা দিয়ে আল্লাহ তোমাদের কাউকে অপর কারো ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লালসা করো না।’ -(সূরা আন নিসা: ৩২)
নবী করিম (সা.) উপমাসহকারে বলেছেন, দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘ ছাগলের পালে ছেড়ে দিলে যে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, সম্মান লিপ্সা ও সম্পদের লোভ মানুষের দ্বীনের জন্য তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।’ (তিরমিজি)
হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) লোভ-লালসাকে দুশ্চিন্তা ও যন্ত্রণার উপকরণ বলে উল্লেখ করে বলেছেন, ‘ইমান ও লোভ এক অন্তরে একত্র হতে পারে না। এর কারণ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কেননা, ইমানের পরিণাম হচ্ছে ধৈর্য, সহনশীলতা ও অল্পে তুষ্ট থাকা। লোভ-লালসার পরিণাম অশান্তি, ধৈর্যহীনতা ও অস্বস্তিবোধ।’ -(নাসাঈ ও তিরমিজি)
ধর্মপ্রাণ মু’মিন বান্দা কখনো অন্যের সম্পদের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকায় না। ধনসম্পদ আহরণ দোষের হয় তখন, যখন অন্যের সম্পদের ওপর লোভাতুর দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয় এবং অবৈধ উপায়ে তা অর্জনের চেষ্টা চালানো হয়।খ্যাতি-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ও ধনসম্পদের মোহ সমাজজীবনে সব অনিষ্টের মূল। প্রকৃতপক্ষে ধন-সম্পদের লিপ্সা ও খ্যাতির প্রতি অতিশয় মোহ নিতান্তই ক্ষতিকারক।
বলা হয়ে থাকে, ‘লোভী বঞ্চিত।’ যেহেতু লোভ মানুষের সব দুর্নীতি ও অপকর্মের মূল উৎস, তাই ইহলৌকিক ও পরকালীন জীবনে সাফল্যের জন্য লোভ-লালসার কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে হবে। মানুষকে সৎ চরিত্রবান হতে হলে, মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হলে ও আদর্শ সুশীলসমাজ গড়তে হলে প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মু’মিন মুসলমানের উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে লোভ-লালসা ও দুর্নীতি থেকে দূরে থাকা।
তাছাড়া প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলার ৯৯টি গুণবাচক নাম আছে। যে ব্যক্তি এ গুণবাচক নামগুলোর জিকির (আমল) করবে; সে জান্নাতে যাবে।’
দুনিয়ার কোনো প্রেসক্রিপশন বা ঔষধ দিয়ে এ রোগমুক্ত হওয়ার উপায় নেই। আল্লাহ তা’য়ালার গুণবাচক নামের আমলেই এ বদ স্বভাব ও গোনাহের কাজ থেকে মুক্ত হওয়া যায়। আল-গানিয়্যু আল্লাহ তা’য়ালার গুণবাচক নামসমূহের একটি। মু’মিন বান্দা নিয়মিত এ গুণবাচক নামের আমল করলে লোভ-লালসা নামক অন্তরের মহাব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া যায়।
রোজা দেহের যাকাতস্বরূপ। যাকাত আদায় করলে যেমন সমস্ত সম্পদ পবিত্র হযে যায়, তেমনি রোজা রাখলে সমস্ত শরীর পবিত্র হয়ে যায়। হাদিস শরিফে রোজাকে ইবাদতের দরজা বলা হয়েছে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘রোজা মানুষের জন্য ঢালস্বরূপ যতক্ষণ না সেই ঢালকে কেউ বিনষ্ট করে ফেলে, আর মিথ্যা ও পরনিন্দা দ্বারা এ ঢাল বিনষ্ট হয় বা এর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়ে যায়।’ সুতরাং রোজাদার ব্যক্তি যদি লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, মিথ্যা কথা, পরনিন্দা, অসৎ কাজ প্রভৃতি পাপাচার থেকে আত্মরক্ষা করে থাকেন, তবেই রোজা শান্তি, মুক্তি ও কল্যাণের কারণ হতে পারে।

রোজার মাধ্যমে মানুষকে জাগতিক লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ, ফেতনা-ফ্যাসাদ, পরচর্চা-পরনিন্দা প্রভৃতি অন্যায় আচরণ পরিহার করার এবং উন্নততর আদর্শের অনুসারী হওয়ার অপূর্ব সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। লোভ-লালসা প্রতিনিয়ত মানুষকে অন্যায় ও জুলুমের দিকে ধাবিত করছে। তাই রোজাদার বান্দার মূল লক্ষ্য থাকবে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভ ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে ধনসম্পদ, মানসম্মান, ক্ষমতা, পদমর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রতি লোভ-লালসা দ্বীন ইসলাম ও ইমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
লোভের বশবর্তী হয়ে জোরপূর্বক কর্তৃত্ব গ্রহণ,নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা লাভের জন্য কলহ-বিবাদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। বিবেকবান ধর্মভীরু মানুষ জীবনকে সুন্দর ও পবিত্র রাখার জন্য লোভ-লালসা বর্জন করে চলেন। যে ব্যক্তি লোভ জয় করতে পারে না, সে তার লালসা চরিতার্থ করার জন্য অন্যায় ও অবৈধ পন্থা অবলম্বন করার ফলে অপহরণ, গুম, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতো হয়ে পড়ে। লোভী ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তির নিজের কর্মকান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না এবং দুর্নীতির পরিণাম সম্পর্কেও সে চিন্তাভাবনা করে না। ফলে অতিশয় লোভের পরিণতিতে সে বিপদগ্রস্ত হয় এবং তার জীবনে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই ইহলৌকিক ও পরকালীন জীবনে সাফল্যের জন্য লোভ-লালসার কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চেষ্টা চালাতে হবে। প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে কিছু পেলে শোকর করে, আর না পেলে সবর করে থাকে।
হযরত আলী (রা.) বলেন, ‘‘দুনিয়া যদিও তোমার পেছনে দৌঁড়ায়, তুমি কখনো দুনিয়ার পেছনে দৌঁড়িও না।’’ মানুষকে সৎ চরিত্রবান হতে হলে, মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হলে ও আদর্শ সুশীল সমাজ গড়তে হলে প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে লোভ-লালসা বর্জন করে দুর্নীতিমুক্ত জীবনযাপনে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার অনুশীলন করে জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। দুনিয়ার লোল-লালসা, মোহ-মায়া, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা সবই বৃথা, সবই মরীচিকা। লোভ সুন্দর জীবনকে এলোমেলো করে : দুনিয়ার বাহাদুরি ও ক্ষমতা ক্ষণিকের। পরকালে নেক আমল ছাড়া কোনো কিছুই কারো কাজে আসবে না। হজরত ওমর রা: বলেন, ‘লোভ করলে আত্মা দরিদ্র হয়ে যায় বা মন মরে যায়। ইবাদতে স্বাদ পাওয়া যায় না। হযরত মূসা আ: আল্লাহ তা’য়ালকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহ! প্রকৃত ধনী কে? আল্লাহ বললেন, ‘যে লোভ করে না সেই প্রকৃত ধনী’ ।
লোভ মানুষের এক স্বভাবজাত বিষয়। লোভ করলে পাপ হয়, আর পাপ মরণ ডেকে আনে। সুতরাং লোভই হচ্ছে সকল অন্যায়ের মূল। এই তো এর সাদামাটা মর্ম। স্বভাব ও চরিত্রের অন্যান্য মন্দ বিষয়ের মতো এই লোভকেও তাই নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। নিয়ন্ত্রণহীন লোভ পরিণতিতে ধ্বংস ডেকে আনবেই। লোভ যে কতটা ভয়াবহ পরিণতির মুখে আমাদের দাঁড় করিয়ে দিতে পারে এর নজির তো আমরা প্রতিদিনই পাই। ক্ষমতার দাপটে, অর্থ-বিত্তের দাপটে, পদমর্যাদার দাপটে মানুষ নির্দ্বিধায় এ লোভকে কাজে লাগায়।জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষই প্রবৃত্তির এই অদৃশ্য শক্তিশালী চাহিদার শিকার হয়। নাফস শয়তানই এই অবৈধ প্রবৃত্তিকে মনুষ্য চরিত্রে লালন করতে সাহায্য করে। তাই মানুষের মধ্যে অনেকেই অজ্ঞতাবশত এই প্রবৃত্তির দাসত্বে আত্মসমর্পণ করে। একদা কুফার লোকজন দুনিয়ার লোভে ও জীবনের মায়ায় ইমাম হুসাইনকে ছেড়ে ইয়াজিদের দলে যোগ দিয়েছিলো। যে ব্যক্তি নিজের নফ্সে আম্মারার সঙ্গে যুদ্ধ করে ইহাকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়, সে ব্যক্তিই স্বীয় সত্তার পক্ষে বিশেষ কারামাতের অধিকারী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নসসে আম্মারার সঙ্গে যুদ্ধ করে আল্লাহ তা’য়ালাকে সেই পায়। সুফিতত্ত্ব অনুযায়ী,মানুষের লোভ-লালসা এবং নফস বা রিপুর আবেদন তাকে গোমরাহ বা বিপদগামী করার জন্য প্রতিদিন ৩৬০ প্রকারের রূপ বদল করে এবং বান্দাকে সঠিক পথ থেকে দূরে সরিয়ে নফসের গোলামিতে লিপ্ত রাখে। সুতরাং মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত শরিয়ত ও আহকামে এলাহির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং সেগুলো মেনে চলবে, নফস তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। লোভ-লালসা মারাত্মক পাপাকের কাজ। এটা মানুষের চারিত্রিক ব্যাধি। এ ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকতে কোরআন-সুন্নাহ জ্ঞান ও আমলের বিকল্প নেই।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট