শিক্ষক সুনিপূণ ও মূল্যবোধ বিনির্মাণের আদর্শ কারিগর

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
শিক্ষা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার আর শিক্ষক হলো তার সুনিপূণ ও মূল্যবোধ বিনির্মাণের আদর্শ কারিগর। আজ (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সমাজ গড়ার কারিগর হলেন শিক্ষক। আদর্শ শিক্ষকের হাত ধরেই তৈরি হয় আদর্শ ছাত্র-ছাত্রী। একজন মানুষের সফতার পেছনে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ওই ব্যক্তিই উপলব্ধি করতে পারেন। একজন আদর্শ শিক্ষক কেবলমাত্র পড়াশোনার ক্ষেত্রে নয়, তিনি ছাত্রকে জীবনে চলার পথে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, ব্যর্থতায় পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দেন, সাফল্যের দিনে নতুন লক্ষ্য স্থির করে দেন। তিনি তাকে শুধুমাত্র জীবনে সফল হওয়া নয়, কিভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয় শেখান।

শিক্ষক দিবস হলো শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটি বিশেষ দিবস যা বাংলাদেশ এবং ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপিত হয়।এদিন শিক্ষকদেরকে তাদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মাননা দেয়া হয়। ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপিত হলেও সেপ্টম্বরের ৫ তারিখ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্ব শিক্ষক দিবস। পৃথিবীর সকল দেশের শিক্ষক সমাজের নিকট এ দিনটি অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার। তবে শিক্ষক দিবস পালনের ইতিহাস খুব বেশিদিন আগের নয়। দেশের অগণিত শিক্ষকদের আদর্শগত মহান কর্মকান্ডের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁদের পেশাগত অবদানকে স্মরণে-বরণে শ্রদ্ধায় পালন করার জন্য সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মহান শিক্ষক পালন করার রীতি রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই বিভিন্ন দেশে শিক্ষক দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়া হতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশে কোনো বিখ্যাত শিক্ষক কিংবা উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জনকে উপলক্ষ করে এই দিবস পালন করা হয়। ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষকরা যেমনই থাকুক,প্রতিবছর অসাধারণ সব প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ উদযাপিত হয়। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর তারিখ বিশ্ব ব্যাপী পালিত হয়ে থাকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করতে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে দিনটি।১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬ তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউনেস্কো মহাপরিচালক ড.ফ্রেডারিক এম মেয়রের যুগান্তকারী ঘোষণার মাধ্যমে ৫ অক্টোবর “বিশ্ব শিক্ষক দিবস“ পালনের শুভ সূচনা করা হয়। এর পর থেকে ১৯৯৫ সালের ৫ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এটি সারা দেশ বিদেশে ‘শিক্ষক’ পেশাজীবিদের জন্য সেরা সম্মান।পরবর্তী প্রজন্ম ও যাতে কার্যকরী ও যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে এই দিনটি পালন করে সেটাও উদ্দেশ্য।

ইউনেস্কোর মতে,শিক্ষা ও উন্নয়নে শিক্ষকরা বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। মানুষের মধ্যে সচেতনতা, উপলব্ধি সৃষ্টি ও শিক্ষকদের ভূমিকার স্বীকৃতিস্মারক হিসেবে দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। মানবিক বিপর্যয় বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে আক্রান্ত হয়েও সামাজিক,অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনির্মাণে শিক্ষকরা তাদের ভূমিকা রেখে চলেছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন আলোচনা সভা ও শোভাযাত্রাসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

শিক্ষক দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন হয়। বিশ্ব শিক্ষক দিবস হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষকদের সম্মানার্থে পালিত একটি বিশেষ দিবস। বিশ্ব শিক্ষক সঙ্ঘ তথা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের ক্রমাগত প্রচেষ্টায় এবং ইউনেস্কো-আইএলও এর সদিচ্ছায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সরকার সম্মেলন। এই সম্মেলনে ইউনেস্কা-আইএলও সুপারিশ ১৯৬৬ প্রণীত হয়। এই সুপারিশ হলো শিক্ষকদের অধিকার,কর্তব্য ও মর্যাদার সুপারিশ। এটি কোনো সরকারি ছুটি নয়।এই দিনটি উদযাপনের তারিখটি দেশ অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মে মাসের প্রথম পুরো সপ্তাহের মধ্যে মঙ্গলবার এই দিবসটি উদযাপন করে এবং যুক্তরাজ্য ৫ অক্টোবর এটি পালন করে।শতাধিক দেশ বিশ্ব শিক্ষক’দিবস উদযাপন করে এবং প্রতিটি দেশ নিজস্বভাবে উদযাপন করে। এই দিনটিতে শিক্ষকদের শিক্ষায় তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থী ও সমাজের উন্নয়নের জন্য তাদের ভূমিকা ও গুরুত্ব প্রশংসা করা হয়। এই দিনটি এমন একটি উপলক্ষ্য যা শিক্ষকদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং তাদের পেশা সম্পর্কিত কিছু সমস্যা সমাধানের প্রবণতা এবং উজ্জ্বল তরুণ মনকে এই পেশার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড হলে শিক্ষকরা শিক্ষার মেরুদন্ড।ক্ষুদ্র জীবনে চলার পথে অনেক মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়। চলতে গিয়ে শিখতে হয় অনেক কিছু। অসংখ্য মানুষের ভেতর যিনি আমাকে আপনাকে সবচেয়ে বেশি শিখিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন একজন শিক্ষক। একজন নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। শিক্ষা আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার আর শিক্ষক হলো তার সুনিপূন কারিগর। শিক্ষক সভ্যতার অভিভাবক, সমাজের অভিভাবক। কার্যত শিক্ষক বলতে একজন আলোকিত, জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিদীপ্ত পন্ডিত ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি সভ্যতার বিবর্তনের অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষা দিতে-নিতে নিবেদিতপ্রাণ সেবক, ব্যবসায়ী নন। আদর্শ শিক্ষক মানুষকে চূড়ান্ত কল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। শিক্ষক মূল্যবোধ বিনির্মাণের আদর্শ কারিগর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মূল্যবোধ চর্চার অনন্য কারখানা। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে সমাজকে করতে পারে আলোকিত ও উদ্ভাসিত। তিনি তাঁর আচার-আচরণ,মন ও মননে নিজেই বটবৃক্ষের প্রতীক। তাঁদের অসামান্য কীর্তি আজীবন তাঁদেরকে জ্বলজ্বল করে রাখে। আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনে খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সৃষ্টিশীল প্রজন্ম গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখেন একজন শিক্ষক। স্বাধীন বাংলাদেশেসহ বিশ্বের সকল শিক্ষকই পারেন সময়োপযোগী নানা পদক্ষেপে নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে একটি জাতিকে শিক্ষিত করে তার সোনালী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

সত্যিকার অর্থে একজন প্রাজ্ঞ,দূরদৃষ্টিসম্পন্ন,বিচক্ষণ শিক্ষক সমাজ বদলে দেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন।একজন আদর্শবান শিক্ষকই পারেন একটি আদর্শবান সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দিতে। একজন শিক্ষক সমাজের সকল নেতিবাচকতা,অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলো দিয়ে আলোকিত করতে পারেন।এজন্যই শিক্ষককে শুধুমাত্র তাঁর পেশার মানদন্ডে পরিমাপ করা যাবে না। কারণ সত্যিকারের জ্ঞান মানুষকে মুক্তির পথ দেখিয়ে থাকে। রাসুল (সা.) শিক্ষা, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষক ও শিক্ষার বিতিকরণে সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাই তো প্রিয় নবী (সা.) বদরের যুদ্ধবন্দিদের মুক্তির জন্য মদিনার শিশুদের শিক্ষা দেওয়ার চুক্তি করেছিলেন। যার মাধ্যমে তিনি বন্দিদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন, যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। শিক্ষক সম্পর্কে এ পি জে আবদুল কালাম বলেছিলেন,‘যদি একটি দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং সুন্দর মনের মানুষের জাতি হতে হয়,তাহলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এ ক্ষেত্রে তিনজন সামাজিক সদস্য পার্থক্য এনে দিতে পারে। তারা হলেন বাবা, মা এবং শিক্ষক।’অ্যারিস্টটল বলেন-‘যাঁরা শিশুদের শিক্ষাদানে ব্রতী তাঁরা অবিভাবকদের থেকেও অধিক সম্মাননীয়। পিতামাতা আমাদের জীবনদান করেন ঠিকই কিন্তু শিক্ষকরা সেই জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।’রবীন্দ্রনাথ বলেন,“আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সেই গুরুকেই খুঁজিতেছি,যিনি আমাদের চিত্তের গতিপথকে বাধামুক্ত করিবেন”।উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড-এর মতে,‘একজন সাধারণ শিক্ষক বক্তৃতা করেন,একজন ভালো শিক্ষক বিশ্লেষণ করেন, একজন উত্তম শিক্ষক প্রদর্শন করেন,একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন’।

একটি দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন,অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন,টেকসই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সার্বিক অগ্রগতিতে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। শিক্ষক একজন শিল্পীর ন্যায়; তিনি মানব মনের সহজাত প্রবৃত্তি/শক্তি ও সুপ্ত সম্ভাবনার পরিস্ফুটন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানুষ তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকেন। একজন শিক্ষক শুধু কাক্সিক্ষত বিষয়বস্তু পাঠদানই করেন না,পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীর মনে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ, নৈতিকতাবোধ,মূল্যবোধ সৃষ্টিতেও অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে থাকেন। অধিকন্তু কায়িক শ্রমের মর্যাদা, নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ, সৃজনশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা,শিক্ষার্থীদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো, সামাজিক অগ্রগতির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয়ে অপরিহার্য কূশলী হিসেবে শিক্ষক সম্পৃক্ত থাকেন।

শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, শিক্ষকতা একটি মহান ব্রত। গোটা মনুষ্য সমাজের মধ্যে নৈতিক বিচারে শিক্ষকদের চেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি এবং শিক্ষকতার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশা আর একটিও নেই। একজন আদর্শ শিক্ষক জানেন তার চলার পথ কণ্টকাকীর্ণ এবং ভবিষ্যৎ বিড়ম্বনাময়। তবু তিনি হৃদয়ের টানে এই সুকঠিন জীবিকার পথ বেছে নেন। এজন্য তাকে জীবনব্যাপী সংগ্রাম করতে হলেও তিনি আদর্শচ্যুত হন না। সর্বদা ন্যায়নীতির প্রশ্নে তিনি আপোসহীন। শিক্ষক ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ নামে আখ্যায়িত। শিক্ষানিকেতন তার কর্মশালা। তিনি শিক্ষার্থীর মনন, মেধা ও আত্মশক্তির বিকাশ, পরিশীলন, উন্নয়ন ও প্রসার সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। সমাজ ও জাতি গঠনে, দেশের শিক্ষা-সংস্কৃতির উন্নয়নে, দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে,বিশ্বের দরবারে নিজ দেশের গৌরবময় অবস্থান গড়ে তুলতে একজন আদর্শ শিক্ষকের অবদান একজন রাষ্ট্রনায়ক,রাজনীতিবিদ,অর্থনীতিবিদ বা সমাজনেতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। তাই বলা যায়,একজন আদর্শ শিক্ষক দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও শ্রেষ্ঠ মানুষের অন্যতম। জাতি সঙ্গত কারণেই শিক্ষকের কাছে অনেক প্রত্যাশা করে।

শিক্ষকেরা জাতির দর্পণ।তারা জাতির নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের পথ প্রদর্শক। নেতৃত্ব সৃষ্টি ও জাতি গঠনে তাদের ভূমিকার বিকল্প নেই। কোন জাতি কতটা উত্তমরূপে পরিচালিত হচ্ছে; সেটা নির্ভর করছে সে জাতির শিক্ষকসমাজ কতটা যোগ্যতর।শিক্ষকদের মূল্যায়ন করার ক্ষমতা তখনি সে জাতির হবে,যখন জাতির নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরা তাদের শিক্ষকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে মনে করবে।

শিক্ষক দিবসে শিক্ষার্থীরা কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং তাদের শিক্ষকদের আনন্দিত করার জন্য তাদের শিক্ষকদের কবিতা আবৃত্তি করা, তাদের শিক্ষকদের শিক্ষাগত দক্ষতার অনুকরণ,গান,শিক্ষক এবং শিশুদের একসাথে গেম খেলে আনন্দিত করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে শিক্ষকরা।শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের উপহার দেয়। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষককে হাতে লিখিত কার্ড বা ফুল দিতে পারে। এই দিনটিতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর মধ্যে সম্পর্কটি তাদের সাথে সাক্ষাত করে বা তাদের বার্তাকে স্মরণীয় করে রাখার মাধ্যমে উপভোগ করা যেতে পারে যাতে তাদের দিনটি স্মরণীয় হয়ে যায়।

শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। ব্যক্তির জীবন গড়ে তোলায় শিক্ষকের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়, শিক্ষকের কথা বলা, জীবনাচার, পছন্দ-অপছন্দ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রেখাপাত করে শিক্ষার্থীর মানসপটে। কোনো কোনো শিক্ষক হয়ে ওঠেন আইকন। বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধুমাত্র শিক্ষকদের ন্যায্য স্বার্থ সংরক্ষণের কথাই বলেনা, বরং আগামি প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষার কথা চিন্তা করে শিক্ষকতা পেশাকে আরো আকর্ষনীয় এবং শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করনের কথাও বলে। শিক্ষকদের স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের জন্য জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটবে।

এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল মনে করে জাতীয় স্তরে সমগ্র বিশ্বেই একটি বিশেষ দিনকে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরী।যেটি সমাজ সংস্কার শিক্ষায় শিক্ষকদের উপযুক্ত মান্যতা দান করার যোগ্য দিন। শুরু থেকে বাংলাদেশ এ দিবসটি পালন করে আসছে। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন দিবসটি পালন করে থাকে। ইউনেস্কোর মতে,‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস‘শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর তারিখ বিশ্ব ব্যাপী পালিত হয়ে থাকে বিশ্ব শিক্ষক দিবসফঃ। এই দিবসটি শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য পালন করা হয়। ইউনেস্কোর মতে,বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পালন করা হয়। বিশ্বের ১০০টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। এই দিবসটি পালনে এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল ও তার সহযোগী ৪০১টি সদস্য সংগঠন মূল ভূমিকা রাখে। দিবসটি উপলক্ষে ইআই প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করে থাকে যা জনসচেতনতা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষকতা পেশার অবদানকেও স্মরণ করিয়ে দেয়।
২০১৭ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো ”স্বাধীনভাবে পাঠদান, শিক্ষক হবেন ক্ষমতাবান” ২০১৮ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো “শিক্ষার অধিকার মানেই একজন যোগ্য শিক্ষকের অধিকার“। ২০১৯ সালে এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো “তরুন শিক্ষক, পেশার ভবিষ্যত“। ২০২০ সালে ও এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ” শিক্ষকঃ সংকটে নেতৃত্ব, নতুন করে ভবিষ্যতের ভাবনা”। এ দিবসে শিক্ষকদের মহত্তম পেশার প্রতি পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থাটাই যেন শ্রদ্ধায় নুইয়ে পড়ে। শিক্ষকদের প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়ার লঙ্কাকান্ড ও হয়। মিডিয়াগুলোতে শিক্ষকদের সম্মানে ক্রোড়পত্র, বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধ ছাপা হয়। শুধু দুঃখটা একটাই শিক্ষকদের আক্ষেপটা কেউ বুঝবে না।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রাক্ষালে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষক সমাজের বর্তমান অবস্থান নিয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ থেকে যায়। বৃটিশ শাসনামল কিংবা পাকিস্তানীদের শাসনকালে শিক্ষা ও শিক্ষকদের উন্নয়নে কেউ হাত দেয়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিক্ষায় যে আশার আলোটি জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর স্বপরিবারে নিহত হবার পর সেটি একেবারে নিভে যায়। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট আলোর মুখটুকু দেখতে পারে নাই। সেই থেকে আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষকদের দূর্দিনের সুত্রপাত। এর খেসারত আজ গোটা জাতিকেই দিতে হচ্ছে।

শিক্ষকরা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর।একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত রূপে মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা মার চেয়ে শিক্ষকের অবদান কোন অংশেই কম নয়। মহান রাব্বুল আলামিন শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান দান করেছেন। তাই সমাজে শিক্ষক বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। শিক্ষাদানের মহান ব্রত যার কাজ তাকেই শিক্ষক বলা হয়।স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিতদেরই শিক্ষক বলা হয়।শিক্ষার্থীর মানবতাবোধ কে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান কে সার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরাণ্বিত করেন। একজন শিক্ষকের মৌলিক গুণাবলি যা মৌলিক মানবীয় গুণাবলি ও আদর্শবাদিতার সাথে সম্পৃক্তগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য মৌলিক গুণাবলি ছাড়াও আরো কতক গুণ রয়েছে যা একজন আদর্শ শিক্ষকের অর্জন করা জরুরি। সেগুলোর বিশদ উল্লেখ না করে মৌলিক গুণাবলির অধিকারসম্পন্ন একজন শিক্ষক কিভাবে একটি সাধারণ বা আদর্শহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে পারবেন সে বিষয়ে আলোকপাত করার জরুরি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে তৈরি করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করতে হয় শিক্ষককে।শিক্ষক হচ্ছেন শিক্ষা প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করে এগিয়ে নেয়ায় অনুপ্রেরণাদানকারী ব্যক্তি। জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের অংশগ্রহণ মানুষকে আলোকিত হতে সাহায্য করে। কোনো বিষয় চর্চা বা অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষক ধারণা ও জ্ঞান অর্জন করে এবং ঐ জ্ঞানের জ্যোতির দ্বারা নিজে আলোকিত হতে ও সমাজকে জ্যোর্তিময় করতে সহায়তা করে।
শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। আর এই মেরুদন্ড সোজা রাখতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে শিক্ষকরা। শিক্ষাকে যাবতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলে, শিক্ষকের ভূমিকার গুরুত্ব অপরিসীম। বলতে গেলে এর বিকল্প নেই। পবিত্র কোরআনে নাজিলকৃত প্রথম আয়াতে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা সংক্রান্ত কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,“পড়ো! তোমার সৃষ্টিকর্তা প্রভুর নামে। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নিষিক্ত ডিম্ব থেকে। পড়ো! তোমার প্রতিপালক মহান দয়ালু। তিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন কলমের। আর মানুষকে শিখিয়েছেন,যা সে জানতো না।“(সূরা আলাক,আয়াত ১-৫)। পরিশেষে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, একজন সত্যিকারের আদর্শবান, ন্যায়-নীতি সম্পন্ন শিক্ষক ব্যক্তির অন্তর থেকে, সমাজের ভেতর থেকে অন্ধকার দূর করে আলো দ্বারা আলোকিত করতে পারেন। যে আলোয় একজন ব্যক্তির স্রষ্টার নৈকট্য পেতে সুবিধা হয়।

মানুষ প্রাকৃতিকভাবে মূর্ত ও প্রত্যক্ষ নমুনা দ্বারাই বেশি প্রভাবিত হয়। পঠিত বই বা শ্রুতবাণী দ্বারা তেমন প্রভাবিত হয় না। আর একজন ছাত্রের সামনে মূর্ত নমুনা হলো,তার আদর্শ শিক্ষক।তার মন-মানসিকতা গঠন ও পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন শিক্ষক।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্যের আলোকে দেশের শিক্ষক সমাজকে যে কোনো সংকটে নেতৃত্ব দেবার শক্তি ও সামর্থ্য অর্জনে আরো বেশি সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকেরা অতীতে সকল জাতীয় সংকটে নেতৃত্ব দিয়েছেন।বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানী আমলে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বের ভুমিকা পালন করেছেন। বর্তমান সময়ে করোনা মহামারিতে শিক্ষার ধ্বস ঠেকিয়ে দেশ ও জাতিকে এই কঠিন দুঃসময়ে নেতৃত্ব দিতে দেশের শিক্ষক সমাজ সর্বদা তৎপর আছেন। যে কোনো সংকটে শিক্ষকের নেতৃত্ব দেবার সামর্থ্যটুকু আগে থেকেই অর্জন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে সত্যিকারের মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায় ইতিহাসে অমর একটি আসনে অধিষ্ঠিত হবার সুযোগটি গ্রহণ করুন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এ দেশের শিক্ষক সমাজ সারা বছরের মতো আজো আপনার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

মানুষ গড়ার কারিগর একজন শিক্ষকই পারেন একটি সুশিক্ষিত ও উন্নত জাতি গঠন করতে। শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে একজন শিক্ষার্থীর উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। পিতা-মাতা সন্তান জন্ম দিলেও শিক্ষকই তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। একজন শিক্ষকই পারেন শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করে জাতির উন্নয়নে নিযুক্ত করতে। তার চিন্তা-চেতনা ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন একজন শিক্ষক।

শিক্ষক দিবস একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন,এই দিনটি আমাদের জীবন ও সমাজে শিক্ষকদের অমূল্য অবদানকে সম্মান জানানোর দিন। শিক্ষকতা পেশা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পেশাগুলির মধ্যে একটি কারণ তাঁদের ওপরে দেশের নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করার দায়িত্ব রয়েছে। একজন আদর্শ শিক্ষক সবসময় তাঁর ছাত্রদের স্বার্থ বিবেচনা করে তাদের কাজের দক্ষতা উন্নত করতে উৎসাহিত করে। ছাত্রের ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং দক্ষতার স্তরকে উন্নত করতে শিক্ষকের যথেষ্ট ভূমিকা থাকে। তাঁরা ভবিষ্যত প্রজন্মকে যেকোনো অসুবিধা এবং সমস্যার মুখোমুখি হতে পারার জন্য সক্ষম করে তোলে। এজন্য এই দিনটি শুধুমাত্র শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য নিবেদিত।

লেখকঃ শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক,সিংগাইর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়
ও সাবেক সভাপতি,শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি