শিরক হলো একটি অমার্জনীয় অপরাধ যা যাবতীয় আমলকে নষ্ট করে দেয়

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
শিরক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশীস্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা। “শরীয়তের পরিভাষায় যেসব গুণাবলী কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত সেসব গুনে অন্য কাউকে গুণান্বিত ভাবা বা এতে অন্য কারো অংশ আছে বলে মনে করাই শিরক।”
রব ও ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সহিত আর কাউকে শরীক সাব্যস্ত করার নামই শিরক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উলুহিয়াত তথা ইলাহ হিসাবে আল্লাহর সাথে শরীক করা হয়। যেমন আল্লাহর সাথে অন্য কারো নিকট দোয়া করা কিংবা বিভিন্ন প্রকার ইবাদাত যেমন যবেহ, মান্নাত, ভয়, আশা, মহব্বত ইত্যাদির কোনো কিছু গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা।
ইসলাম ধর্মে শির্ক বা শিরক পৌত্তলিকতা বা বহুঈশ্বরবাদ চর্চা করার পাপকে বুঝায় অর্থাৎ শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে সাব্যস্ত করা বা তার উপাসনা করা। শাব্দিকভাবে এর দ্বারা এক বা একাধিক কোনো কিছুকে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অংশীদার সাব্যস্ত করাকে বুঝায়।
শির্ক বা শিরক তাওহীদের পরিপন্থী একটি বিষয়। ইসলামে শিরক হলো একটি অমার্জনীয় অপরাধ যদি না মৃত্যু নিকটবর্তী হবার পূর্বে আল্লাহর নিকট এই অপরাধের জন্যে ক্ষমা চেয়ে না নেয়া হয়। ইসলামের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসারে, আল্লাহ তা’য়ালার কাছে ক্ষমা না চাইলেও মৃত্যুর পর নিজের বিচার অনুসারে তার ইবাদতকারীদের যে কোনো ভুল ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শিরকের অপরাধী দুনিয়াতে ক্ষমা না চাইলে কখনোই ক্ষমা করবেন না।
মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রতিপালকত্বে বিশ্বাস করতো। একইসাথে তারা বিভিন্ন মূর্তি, পাথর, গাছ, নক্ষত্র, ফেরেশতা, জ্বিন, মৃতব্যক্তি ইত্যাদি বস্তু ও জীবের ইবাদত বা উপাসনা করতো। আল্লাহ ছাড়াও ঐসব দেবদেবীকে ভয়-ভীতি, আশা-আকাঙ্খার সাথে ডাকা, বিপদে তাদের কাছে সাহায্য, আশ্রয়, উদ্ধার প্রার্থনা করা এবং তাদের নামে যবাই ও মানত করা ইত্যাদি কর্মকান্ডের মাধ্যমে শির্ক করতো। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,‘‘আর তুমি যদি জিজ্ঞাসা করো, আসমানসমূহ ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা (মুশরিকরা) অবশ্যই বলবে, মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞই কেবল এগুলো সৃষ্টি করেছেন।’’( কোরআন ৪৩:৯)
আল্লাহ তা’য়ালা শির্কের বিপরীত তাওহীদের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করে বলেছেন,‘‘ বলো তিনিই আল্লাহ একক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ কারও মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোনো সন্তান নেই এবং তিনিও কারও সন্তান নন এবং তাঁর সমতুল্য কেহই নেই। (সূরা ইখলাস)
তাওহীদ যেমন প্রধানত তিন প্রকার, একইভাবে এর বিপরীতে শিরকও প্রধানত তিন প্রকার, ১.আল্লাহর সত্তার সাথে শিরক করা তাওহিদে রুবুবিয়াহর বিপরীত। যেমন: আল্লাহর স্ত্রী, পুত্র, কন্যা আছে বলে বিশ্বাস করা। ২. আল্লাহর ইবাদতে শিরক করা তাওহীদে উলুহিয়াহর বিপরীত। উপাসনার নিয়তে কাউকে সিজদা করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। ৩. আল্লাহর গুণাবলিতে শিরক করা তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাতের বিপরীত। যেমন: নবী, রাসূল ও আওলিয়াগণ নিজে থেকে গায়েব জানেন বলে মনে করা ,কারণ গায়েবের জ্ঞান শুধু আল্লাহ জানেন।
‘আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ। সন্তানাদি থেকে তিনি সম্পূর্ণ পবিত্র। আসমান ও যমিনে যা কিছু আছে সবই তো তাঁর।’ (নিসা ১৭১) ‘যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকেও ডাকে। তার সমর্থনে তার হাতে কোনো দলিল প্রমাণ নেই। তার হিসাব-নিকাশ হবে আল্লাহর নিকট। এ ধরনের কাফেররা কিছুতেই কল্যাণ ও সফলতা লাভ করতে পারে না।’ (মু’মিনুন ১১৭)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘‘কবীরা গোণাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া, কাউকে হত্যা করা ও মিথ্যা শপথ করা’’(বুখারী)
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী করিম (সা.) কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, সে তাঁর সঙ্গে শিরক করে না, সে অবশ্যই বেহেশতে প্রবেশ করবে। আর যে তাঁর সঙ্গে শিরক করা অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, সে জাহান্নামে যাবে।’(মুসলিম)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ হতে বিরত থাকবে। সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে সাতটি পাপ কি কি? তিনি বললেন, এগুলো হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা, যাদু করা, শরীয়তের অনুমোদন ব্যতিরেকে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের মাল আত্মসাৎ করা, জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা এবং অচেতন পবিত্র ঈমানদার মহিলাদের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনা। (বুখারী-মুসলিম)
আল্লাহ তা’য়ালা মুশরিকদের জন্যে জান্নাত হারাম বলে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সাথে শিরক করবে আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দেবেন এবং তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। জালিমদের কোনো সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ: ৭২)
শিরকের মাধ্যমে সৃষ্টিকে স্রষ্টার আসনে বসানো হয়, যা মহা অপরাধ এবং রীতি মত অবিচার। আল্লাহ তা’’য়ালা শিরকের গুণাহ তওবা ছাড়া ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ বলেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা তার সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা করবেন না। এ ছাড়া অন্য সকল গুণাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন।” (সূরা নিসা: ৪৮)
শিরক সমস্ত আমলকে বিনষ্ট করে দেয়। আল্লাহ বলেন,“আর যদি তারা শিরক করে তাহলে তাদের সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে।” (সূরা আনআম: ৮৮) আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রত্যাদেশ হয়েছে, যদি আল্লাহর শরীক স্থির করেন, তবে আপনার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের একজন হবেন। (সূরা যুমার: ৬৫)
শিরকে আকবার সবচেয়ে বড় শিরক যা বান্দাকে মিল্লাতের গন্ডী থেকে বের করে দেয়।এ ধরণের শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি যদি শিরকের উপরই মৃত্যুবরণ করে, এবং তা থেকে তওবা না করে থাকে, তাহলে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে।
আল্লাহর ব্যতীত অন্য কিছুর কসম ও শপথ করা। রাসূল (সা.)বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করে, সে কুফরী করে অথবা শিরক করে।” (তিরমিযী)
বিপদাপদ দূর করার জন্য কড়ি কিংবা দাগা বাঁধা, বদনজর থেকে বাঁচার জন্য তাবীজ ইত্যাদি লটকানো। এসব ব্যাপারে যদি এ বিশ্বাস থাকে যে, এগুলো বলাথ-মসীবত দূর করার মাধ্যম ও উপকরণ, তাহলে তা হবে শিরকে আসগার। কেননা আল্লাহ এগুলোকে সে উপকরণ হিসাবে সৃষ্টি করেননি।পক্ষান্তরে কারো যদি এ বিশ্বাস হয় যে, এসব বস্তু স্বয়ং বালা- মুসীবত দূর করে, তবে তা হবে শিরক আকবর। কেননা এতে গায়রুল্লাহর প্রতি সেই ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট।
শিরকে আকবর হলো গায়রুল্লাহর তথা আল্লাহ ছাড়া যে কোনো ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর উদ্দেশ্যে কোনো ইবাদত আদায় করা, গায়রুল্লাহর উদ্দেশে কোরবানী করা, মান্নাত করা, কোনো মৃত ব্যক্তি কিংবা জ্বিন অথবা শয়তান কারো ক্ষতি করতে পারে কিংবা কাউকে অসুস্থ করতে পারে, এ ধরনের ভয় পাওয়া, প্রয়োজন ও চাহিদা পূর্ণ করা এবং বিপদ দূর করার ন্যায় যে সব ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ক্ষমতা রাখেনা সে সব ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে আশা করা। আজকাল আওলিয়া ও বুযুর্গানে দ্বীনের কবরসমূহকে কেন্দ্র করে এ ধরনের শিরকের প্রচুর চর্চা হচ্ছে। এদিকে ইশারা করে আল্লাহ বলেন,‘তারা আল্লাহর পরিবর্তে এমন বস্তুর ইবাদত করে, যা না তাদের কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারে, না করতে পারে, কোন উপকার। আর তারা বলে, এরা তো আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।’ (সূরা ইউনুস ১৮)
গোপন শিরকের স্থান হলো ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়াতের মধ্যে। যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোনো আমল করা। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোনো কাজ করে তা দ্বারা মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করা। যেমন সুন্দরভাবে নামায আদায় করা, কিংবা সদকা করা এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তার প্রশংসা করবে, অথবা সশব্দে যিকির- আযকার পড়া ও সুকন্ঠে তেলাওয়াত করা যাতে তা শুনে লোকজন তার গুণগান করে। যদি কোনো আমলে রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকে, তাহলে আল্লাহ তা বাতিল করে দেন। আল্লাহ বলেন,‘‘অতএব যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাত কামনা করে, সে যেনো সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’’ (সূরা কাহফ: ১১০)
মানুষের মাঝে একটা স্বভাব রয়েছে আর তাহলো তার চেয়ে ভালো অবস্থায় কেউ থাকলে বা তার নিজস্ব অবস্থানের চেয়ে কাউকে বড় দেখলে সে তাকে তার মনের মাঝে এমন একটা জায়গায় স্থান দিতে শুরু করে যে ধীরে ধীরে সে নিজের অজান্তে শিরকে জড়িয়ে পরে। আমাদের অনেকেই প্রায়ই এই ধরণের কথা বলে থাকি-আপনি ছিলেন বলেই আজকে রক্ষা পেলাম! আমি আপনার উপরই ভরসা করছি! আপনি ছাড়া আর কে সাহায্য করবে! আপনি যদি থাকতেন তাহলে কাজটা এরকম হতো না! ভাই সাহায্য করেন, আপনিই একমাত্র পারেন আমাকে সাহায্য করতে! হে দয়ার নবী রক্ষা কর মোরে! হে দয়ার নবী রক্ষা যদি না করো বেহেশতে যেতে পারব না! হে অমুক মাজারবাসী আমার অমুক আশাটা পূরণ করে দেন! কেবলাবাবাই ভরসা! দয়ালবাবা, বাবা ভান্ডারী রক্ষা কর মোরে!
নবী করিম (সাঃ) বলেন, “যে বিষয়ে আমি তোমাদের ওপরে সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক”। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ছোট শিরক কি? তিনি বলিলেন, “ছোট শিরক হচ্ছে রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত।)”(মুসলিম) পার্থিব লোভে পড়ে কোনো আমল করাও এ প্রকার শিরকের অন্তর্গত৷ যেমন কোনো ব্যক্তি শুধু মাল- সম্পদ অর্জনের জন্যেই হজ্জ করে, আযান দেয় অথবা লোকদের ইমামতি করে, কিংবা শরয়ী জ্ঞান অর্জন করে বা জিহাদ করে।
শিরকের পরিণাম ভয়াবহ। এটি মানুষের চুড়ান্ত ধ্বংস ডেকে আনে। শিরক সবচেয়ে বড় অপরাধ-বড় গুণাহ। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন এক ব্যক্তি বলল,“হে আল্লাহর রাসূল সবচেয়ে বড় গোণাহ কোনটি?” রাসূল(সা.) বললেন, “আল্লাহর সাথে শরীক করা, অথচ আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম)
তাওহীদ হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের মূল ভিত্তি। তাওহীদ সকল নবী-রাসূলের দাওয়াতের কেন্দ্রীয় বিষয়। আল্লাহর নিকট ইবাদত কবুলের শর্ত হচ্ছে তাওহীদ। বিপরীত দিকে শিরক হচ্ছে জঘন্যতম পাপ। শিরকের অপরাধীকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না। শিরক যাবতীয় আমলকে নষ্ট করে দেয়, জাহান্নামের দিকে টেনে নেয়। তাই আমাদের তাওহীদের পাশাপাশি শিরক সম্পর্কেও ইলম্ অর্জন করতে হবে। শিরক সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে আমরা আমাদের অজ্ঞাতেই আল্লাহ না করুন শিরক জড়িয়ে যেতে পারি। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।” (সূরা, যূমার ৩৯ঃ৯)
খারাপ বা মন্দ ধারণাই শিরকের নেপথ্য কারণ। যে কোনো শিরকের পেছনে আল্লাহ সম্পর্কে কোনো না কোনো দোষ-ত্রুটি ও মন্দ ধারণা কাজ করে। ভালোবাসার বিপরীত এ মন্দ ধারণা পোষন করার কারণেই মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে অন্যেও ইবাদত করে। গায়রুল্লাহকে তার জন্য আল্লাহর চেয়ে অধিক দয়ালু ও কল্যানকামী মনে করে। আল্লাহ সম্পর্কে যারা মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,“এবং মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষন করে আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র তাদের জন্য। আল্লাহ তাদের ওপর রাগান্বিত হয়েছেন এবং তাদের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন এবং তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন, তা কতো নিকৃষ্ট আবাস।” (সূরা ফাতহ ৪৮ঃ৬)
পীরদের আস্তানা, দরবার বা তথাকথিত খানক্বা শরীফ ইসলামের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য বিদ্রোহ। শুধু আক্বীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই নয় বরং তারা আমলের ক্ষেত্রেও রাসূল (সা.) আনীত বিধানের সাথে বিদ্রোহ করেছে। বাস্তব কথা এইযে, খানক্বা, মাযার, দরবার বা পীরদের আস্তানায় ইসলামের যতটুকু অসম্মান হয়েছে ততটুকু অসম্মান মন্দির, গির্জা বা চার্চেও হয়নি।
পীর-বুযুর্গদের কবরের উপর ঘর বা গুম্বজ তৈরি করা, কবরকে সাজ-সজ্জা বা আলোকিত করা, কবরের ওপর ফুল ছড়ানো, কবরকে গোসল দেয়া, কবরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কবরের খাদিম হয়ে তার পার্শ্বে অবস্থান করা, কবরের জন্য কোনো কিছু মানত করা, কবরকে উপলক্ষ করে খানা বা শিরনি বিতরণ করা, পশু জবাই করা, কবরের জন্য রুকূ’-সিজ্দাহ্ করা, কবরের সামনে দু’ হাত বেঁধে বিনম্রভাবে দাঁড়ানো, কবরে শায়িত ব্যক্তির নিকট কোনো কিছু চাওয়া, তাদের নামে চুলের বেণী রাখা বা শরীরের কোথাও সুতা বেঁধে দেয়া, তাদের নামের দোহাই দেয়া বা বিপদের সময় তাদেরকে ডাকা, মাযারের চতুষ্পার্শ্বে তাওয়াফ করা, তাওয়াফ শেষে কোরবানী করা বা মাথা মুন্ডানো, মাযারের দেয়ালে চুমু খাওয়া, বরকতের জন্য কবরের মাটি যত্ন সহকারে সংগ্রহ করা, খালি পায়ে কবর পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যাওয়া এবং উল্টো পায়ে ফিরে আসা ইত্যাদি ইত্যাদি তো যে কোন কবরের জন্যই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যা শির্ক ও বিদ্’আত ছাড়া আর অন্য কিছু নয়।
সুতরাং একজন মুমিন সর্বদা শিরকের ব্যাপারে ভীত থাকবে। শিরক থেকে বেঁচে থাকবে। জীবন চলে যাবে তবুও সামান্যতম কোনো ব্যাপারে শিরকে লিপ্ত হবে না। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তা’য়ালার একটি গুণবাচক নাম হলো গফুর বা ক্ষমাশীল। মহান আল্লাহ তায়ালা চাইলে তার বান্দার সকল গুণাহ মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু কিছু গুণাহ আছে যেগুলো মহান আল্লাহ তায়ালা কখনোই মাফ করবেন না, এমন একটি গুণাহ হলো শিরক।
সূফীদের আক্বীদা-বিশ্বাস কোর’আন ও হাদীসের সরাসরি বিরোধী হওয়ার দরুন মানুষ যেনো সেগুলো বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে পারে সে জন্য তারা বা’তিন শব্দের আবিষ্কার করে। তারা বলে: কোর’আন ও হাদীসের দু’ ধরনের অর্থ রয়েছে। একটি জা’হিরী। আরেকটি বা’তিনী এবং বা’তিনী অর্থই মূল ও সঠিক অর্থ। তারা এ বলে দৃষ্টান্ত দেয় যে, জা’হিরী অর্থ খোসা বা খোলসের ন্যায় এবং বা’তিনী অর্থ সার, মজ্জা ও মূল শরীরের ন্যায়। জা’হিরী অর্থ আলিমরা জানে। কিন্তু বা’তিনী অর্থ শুধু ওলী-বুযুর্গরাই জানে। অন্য কেউ নয় এবং এ বা’তিনী জ্ঞান শুধুমাত্র কাশ্ফ, মুরাক্বাবাহ্, মুশাহাদাহ্, ইল্হাম অথবা বুযুর্গদের ফয়েয বা সুদৃষ্টির মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আর এ গুলোর মাধ্যমেই তারা শরীয়তের মনমতো অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। যেমন: তারা কোর’আন মাজীদের নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলে, ‘‘তুমি তোমার প্রভুর ইবাদাত করো এক্বীন বা মা’রিফাত হাসিল হওয়া পর্যন্ত। যখন মা’রিফাত হাসিল হয়ে যাবে তথা আল্লাহ্ তা’য়ালাকে চিনে যাবে তখন নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ও তিলাওয়াতের কোনো প্রয়োজন হবেনা। অথচ মূল অর্থ এই যে, তুমি তোমার প্রভুর ইবাদাত করো মৃত্যু আসা পর্যন্ত’’। (’হিজ : ৯৯)
মক্কার কাফিররা সংকট মুহূর্তে নিজ মূর্তিদের কথা ভুলে গিয়ে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার নিকটই ফরিয়াদ করতো। তখন আল্লাহ তা’য়ালা তাদেরকে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করতেন। এরপর তারা আবারো আল্লাহ তা’য়ালাকে ভুলে গিয়ে তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করতো। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, বর্তমান যুগের কবর বা পীর পূজারীরা আরো অধঃপতনে পৌঁছেছে। তারা সংকট মুহূর্তেও আল্লাহ্ তা’য়ালাকে ভুলে গিয়ে নিজ পীরদেরকে সাহায্যের জন্য ডাকে। আল্লাহ তা’য়ালা মক্কার কাফিরদের সম্পর্কে বলেন,‘‘তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন তারা একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালাকে ডাকে। অন্য কাউকে নয়। অতঃপর তিনি যখন তাদেরকে পানি থেকে উদ্ধার করে স্থলে পৌঁছে দেন তখন তারা আবারো তাঁর সাথে শির্কে লিপ্ত হয়’’। (আনকাবূত: ৬৫)
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে আরো বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, ‘‘আল্লাহ তা’য়ালা বলেন: মানতের মাধ্যমে আদম সন্তান এমন কিছু অর্জন করতে পারে না যা আমি তার জন্য ইতিপূর্বে বরাদ্দ করিনি। তবে মানতের মাধ্যমে কৃপণের পকেট থেকে কিছু বের করে আনা হয়। কারণ, সে মানতের মাধ্যমেই আমাকে এমন কিছু দেয় যা সে কার্পণ্যের কারণে ইতিপূর্বে আমাকে দেয়নি’’। (আহমাদ্ ২/২৪২)
উম্মে কুল্সুম (রা.) এর কোনো সন্তান হয়নি এমতাবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। যদি আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া কেউ কাউকে সন্তান দিতে পারতো তা হলে নবী (সা.) অবশ্যই তাঁর মেয়েকে সন্তান দিতেন। কারণ, তিনি ’উসমান (রা.) কে খুব বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর ভালোবাসার চিহ্ন এটাও যে তিনি তার আনন্দ দেখবেন। আর এ কথা সবারই জানা যে, যে কোন ব্যক্তি (সে পাগলই হোক না কেনো) তার ঘরে নব সন্তান আসলে সে অত্যধিক খুশি হয়। উপরন্তু নবীর মেয়ের ঘরের সন্তান।
শিরক হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার মানা, আল্লাহর অস্তিত্ব ও গুণরাজিকে কাউকে শরীক করে নেয়া। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ বিভিন্নভাবে খোদার খোদায়ীত্বে শরীক বানিয়েছে। মানুষ কখনো একাধিক খোদা বানিয়েছে। কখনো খোদাকে বিভিন্নভাবে বিভক্ত করেছে। আবার কখনো বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ও বস্তুকে খোদা বানিয়েছে। কখনো নিজেরাই মূর্তি তৈরি করে তার পূঁজা করেছে। আবার কখনো কখনো শক্তিশালী মানুষকে খোদার মর্যাদা দিয়েছে। শিরক সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন- ‘আল্লাহর সঙ্গে শরীক করো না। নিশ্চিত জেনে রেখো শিরক হচ্ছে অতি বড় জুলুম।’ (সূরা : লুকমান- ১৩) ‘নিশ্চয়ই জেনো, আল্লাহর সঙ্গে শরীক বানানোর যে পাপ তা তিনি ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য যে কোনো পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করে দেবেন। বস্তুত যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে, সে তো উদ্ভাবন করে নিয়েছে এক গুরুতর মিথ্যা।’ (সূরা: নিসা-৪৮)
শিরক করলে আল্লাহর হক আল্লাহকে না দিয়ে অন্যকে দেয়া হয়। রাসূল (সা.) বলেন- “বান্দার প্রতি আল্লাহর হক হচ্ছে বান্দা শুধু তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না।” (বুখারী হা/২৬৪৬) অতএব শিরক হলো একটি অমার্জনীয় অপরাধ যা যাবতীয় আমলকে নষ্ট করে দেয়।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,লেখক,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট