শিশুবান্ধব দেশ গড়তে আমাদের নিরবতার সংস্কৃতি ভাঙ্গতে হবে

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
শিশু জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিশুরাই জাতি গঠনের ভিত্তি। আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হলো শিশু। সুতরাং, এদের বাদ রেখে আমরা কখনোই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কল্পনা করতে পারি না। যদি শিশুবান্ধব দেশ গড়তে হয় তবে সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা, দারিদ্রমুক্ত ও মধ্যম আয়ের দেশ অর্জন করতে হয়, তবে শিশুর নৃ-তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা-উভয়ক্ষেত্রে সমান নজর দিতে হবে। শিশুদের ভালো করতে হলে তাদের শিক্ষিত গড়ে তুলতে হলে, তাদের সুখী করতে হবে। শিশুর ধারণ ক্ষমতা অনুসারে শিক্ষা দিলে সে একদিন কালজয়ী বিশেষজ্ঞ হতে পারবে। আনন্দের মাঝেই শিশুর শিক্ষা জীবনের অবস্থান। কঠোর শাসন, নিয়ন্ত্রন, প্রতিকুল পরিবেশ, শিশুর শিক্ষা জীবনকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেয়। শিশুর মনের আনন্দই তার দেহ মনের শক্তির মূল উৎস। আনন্দ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ ছাড়া তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ অসম্ভব।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের’ তথ্য মতে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ২৩ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে ২২২ শিশুকে। এছাড়া এ সময় বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে ১২৯ শিশু। অপহরণের শিকার হয়েছে ৯৪ শিশু। বলা হয়ে থাকে, শিশু মানবজাতির ভবিষ্যৎ। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে শিশু জাতির হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ড সুস্থ না থাকলে মেরুদণ্ড কোনো কাজে আসবে কি? আমরা ১০০ বছর পরের ভবিষ্যৎ দেখে যেতে পারব না, এমনকি তা কল্পনা করাও কঠিন কিন্তু আগামী ২০ থেকে ৪০ পরের ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারি। সে ভবিষ্যৎ বর্তমানেই আছে শিশু রূপে। আগামী ২০ থেকে ৪০ বছরের পরের যে ভবিষ্যৎ আমরা দেখতে পাব, তা আমাদের চারপাশেই শিশুদের ভবিষ্যৎ।

এনে প্রশ্ন জাগে সব শিশু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সর্বোপরি নিরাপদ শিশুবান্ধব পরিবেশ পাচ্ছে কি? জাতীয় শিশুনীতির ৬.১৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। ‘শিশুর অধিকার ও উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় শিশুর উন্নয় নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গৃহীত সব কার্যক্রমে তাদের মতামত ও অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হবে।’ কিন্তু বাস্তবে এসব কতটা হচ্ছে?

‘জাতীয় শিশুনীতি-২০১১’ এর প্রথমে বলা হয়েছে, ‘শিশু জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। এ একটি বাক্যেও মাধ্যমে রাষ্ট্রে শিশুর অবস্থা ও গুরুত্ব সুন্দরভাবে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্টের সব নীতি, কার্যক্রম শিশুকে ঘিরে, আবর্তিত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে কি? শিশুরা আজ ঘরে বাইরে, ধনী-গরিব নির্বিশেষে প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যাচ্ছে, এমন সব অভিনব কায়দার শিশু নির্যাতন করা হচ্ছে, যা কল্পনা করা যায় না। রাস্তাঘাটে চোখ খুললেই দেখা মিলে অসংখ্য শিশু শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। দরিদ্র এসব শিশু জীবনের শুরু থেকেই নিজের সুন্দর ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত। বই-খাতা নিয়ে যাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, মনের আবেগে যাদের খেলাধুলা, দুরন্তপনা ও চঞ্চলতায় মেতে ওঠার কথা, আর তারা কিনা অভাবের ঘানি টানতে টানতে দিশাহীন । সমাজ ও রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না।
মানুষের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষায় বেড়েই চলেছে। বড়দের দ্বন্দ্বের কারণে, এক দোকান থেকে অন্য দোকানে কাজ করতে যাওয়ার অপরাধ, চুরির অপরাধে, গৃহকর্মীর কাজে প্রভৃতি উপায়ে একের পর এক শিশু নির্যাতন ও হত্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে শিশু নির্যাতন বেড়েই চলেছে।

শিশুবান্ধব দেশ গড়তে আমাদের নীরবতার সংস্কৃতি ভাঙ্গতে হবে। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, মিডিয়া ও সাধারণ নাগরিক সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ । প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে পারলে এক্ষেত্রে ভালো কাজ দেবে। ডিজিটাল মধ্যম আয়ের দেশ ও উন্নত দেশ গড়তে হলে শিশু-কিশোরদের আধুনিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

‘শিশু নির্যাতন দমন আইনে’ বলা আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বছরের পর বছর ঝুলে আছে অসংখ্য শিশু নির্যাতনের মামলা। সামাজিক অস্থিরতার বলি হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। ‘শিশু আইন-২০১৩’ এর আলোকে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে শিশু নির্যাতন বন্ধে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নীতিমালা বাস্তবায়ন ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। শিশুরা ছোট বলে তাদেও অধিকার কারও চেঁয়ে কম নয়। তাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত সবার আগে। কেননা তারাই আগামীর ভবিষ্যৎ প্রতি বছর ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্নদিনের সঙ্গে পালিত হয়ে থাকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ সংগ্রামী জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও জাতির জনক শিশুদের নিয়ে ভাবতেন। শিশুদের আনন্দ ও খুশিতে রাখার প্রতি তিনি সবসময় গুরুত্ব দিতেন। শিশুরা মুক্ত আলোয় বেড়ে উঠুক, সৃজনশীলতার প্রয়োগ ঘটাক, এটা তিনি সবসময় চাইতেন। দুস্থ ও গরিব শিশুদের প্রতি তার ছিল অসীম মায়ামমতা। শিশুদের প্রতি তার এ ভালোবাসাকে গুরুত্ব দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ করতে হবে। এ দেশে শিশু নির্যাতনকারীদের কোনো স্থান নেই, থাকতে পারে না।

আগামী দিনের ভবিষ্যৎ কোনো একজন শিশুর নিরাপদ পরিবেশ ব্যতীত উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন সত্যি না-ও হতে পারে। খুলনার রাকিব, বরগুনর রবিউল, সিলেটের সামিউল এর সম্প্রতি বগুড়ার কাহালুতে রাসেলের মতো শিশুদের নির্যাতনের জাঁতাকলে পড়ে অকালে দুনিয়া ছাড়তে হয়েছে। এমন সব আলোচিত ঘটনা তো বটেই, সব শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার বিচার দ্রুত শেষ করতে হবে। প্রতিটি শিশুর জন্য সুস্থ জীবন, উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বেড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিবেশ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। সমাজকে নাড়িয়ে নেওয়ার মতো একটার পর একটা শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে দেশে। সেসব ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অভিযুক্তদের আইনের হাতে সোপর্দ করার পর কয়েকটি ঘটনায় শাস্তিও হয়েছে। কিন্তু তার পরও থেমে নেই শিশু নির্যাতনের ঘটনা। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে লক্ষীপুরের রায়পুর উপজেলার বামনী ইউনিয়নের ভূঁইয়ারহাট এলাকায়। ল্যাবটপ থেকে একটি গেমস ফোল্ডার মুছে ফেলার সন্দেহে চার বছর বয়সী শিশু পিয়াসকে বস্তায় ভরে নির্মমভাবে নির্যাতন করে একটি সুপারিবাগানে ফেলে রাখা হয়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। শিশুটির চোখে ও মুখে বেশ কিছু জখম রয়েছে বলে হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মানুষের সহজাত মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সর্বত্রই অসহিষ্ণুতা দেখা দিয়েছে। এরই প্রভাব পড়ছে সমাজ মানসে। ফলে পিয়াসের মতো শিশুরা আক্রান্ত হয়। এর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। কোন পথে সে সমাধান আসতে পারে, তা সবাইকে ভেবে দেখতে হবে। আমাদের দেশে শিশু নির্যাতনের ঘটনা অহরহই ঘটছে। সামান্য কারণে শিশুদের আঘাত করা হচ্ছে। শিশু রাকিব ও রাজন হত্যাকান্ড দেশে নিরাপত্তা সুরক্ষিত নয়। এমনকি সমাজও প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। মানুষের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোর যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। বড় হয়ে যে শিশুরা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের হাল ধরবে, তাদের সঙ্গে কেন এ নিষ্ঠুর আচরণ? শিশু পিয়াস হয়তো সবার কাছে আদরের ছিল। তাকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ যে তরুণের বিরুদ্ধে, সে-ও তাকে আদর করত বলেই ল্যাবটপ গেমস খেলতে দিত। কিন্তু একটি গেমস ফোল্ডার মুছে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি তরুণটি। প্রায় দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বস্তায় ভরে পিটিয়ে আহত করেছে। এজাতীয় সব অপরোধের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত। সমাজে নানা ধরণের দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে। সহিংসতা হচ্ছে কথায় কথায়, কিন্তু পিয়াসের মতো অবুঝ শিশুরা কেন আক্রান্ত হবে?

এ সমাজ করে শিশুর জন্য নিরাপদ হবে? সরকারের পাশাপাশি আমরা সবাই যদি সচেতন হই, আলোচ্য বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখি, তাহলেই দেশ ও জাতি প্রভূত উন্নতি লাভ করতে পারবে। বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বর্তমান সরকার যেমন সাফল্য দেখিয়েছে, শিশুর অধিকার রক্ষায় এমন সাফল্য অর্জিত হলে তবেই দেশকে শান্তির মডেল করা সম্ভব। আর তাই শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ রোধ করা ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতায় দোষীদের দ্রুত বিচার ও শাস্তি আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সকল আইনকে যুগোপযোগী সংশোধন করতে হবে। দেশকে শিশুবান্ধব করতে হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে শিশুদের অধিকারগুলো অর্জিত হয় এবং প্রতিটি শিশুর শিক্ষা বেড়ে উঠা, আচরণসহ সকল বিষয়ে সমাজের মানুষকে সচেতন ও সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। যাতে শিশুদের অধিকারগুলো অর্জিত হয়। আসুন আমরা সকলেই শিশুবান্ধব দেশ বিনির্মাণের লক্ষে এমন কিছু করি।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব
সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট