শুধুমাত্র সতর্কতা এবং জ্ঞানই পারে আমাদেরকে এইডস রোগ থেকে রেহাই দিতে

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
এইডস সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক রোগগুলোর একটি। বর্তমানে বিশ্বে বহুল পরিচিত এক আতঙ্কের নাম, এক সংক্রামক রোগ, এক মরণ ব্যাধি এমনই একটি রোগ হলো এইডস এর পুরো অর্থ অ্যাকোয়ার্ড ইমিউন ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম। গোটা বিশ্ব এই রোগের ছড়াছড়ি, এবং কি মহামারি তবে খুব মানুষই এই রোগের সঠিক তথ্য সম্পর্কে অবগত আছেন। সত্যিকার অর্থে রোগটি ভীতিকর হলেও প্রতিরোধযোগ্য। হিউম্যান ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) এই রোগের জীবাণু। এইচআইভি সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই সর্বদা এইডস হয়না। কিন্তু যেহেতু একবার সংক্রামক এইচআইভি শরীরে ঢুকলে তাকে পুরোপুরি দূর করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, তাই এইচ আই ভি সংক্রমণ হলে এইডস প্রায় অনিবার্য। তবে বিনা চিকিৎসায় এইডস পর্যায়ে পৌঁছতে যদি লাগে গড়ে দশ বছর তবে চিকিৎসার দ্বারা তাকে আরো কিছু বছর পিছিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ‘‘হারর্ট’’ নামে এইডস এর যে কম্বিনেশন ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা পদ্ধতি তা অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ।

এই রোগের জন্য দায়ী এইচআইভি ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের মাত্র এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই এর লক্ষণগুলো দেখা দিতে শুরু করে। এইচআইভি ধীরে ধীরে আমাদের রোগ প্রতিরোধক কোষগুলোকে ধ্বংস করতে থাকে। আর এই ধ্বংসযজ্ঞ যখন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায় তখনই এইডস হয়। এইডস হলে একই সঙ্গে অনেকগুলো রোগ আক্রমণ করে বসে। যার ফলে নিশ্চিত মৃত্যু হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথম মানবদেহে এইডস রোগ ধরা পড়ে। বিশ্ব জুড়ে এইডস আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত অর্ধেক রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা পাচ্ছেন। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এইডসবিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনএইডস এজেন্সির মতে, গত বছর প্রায় দশ লাখ লোক এইডস রোগে মারা গেছে, যা ২০০৫ সালের তুলনায় অর্ধেক। ২০১৬ সালে মোট এইডস রোগী ছিল ৩ কোটি ৬৭ লাখ যার মধ্যে ১ কোটি ৯৫ লাখ রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। এ কারণে এইডস রোগীদের জীবনের মেয়াদ বাড়ছে। গত এক দশকে এইডস রোগীদের আয়ুঙ্কাল ১০ বছর বেড়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শতাব্দীর আশির দশকে এইডস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৭ কোটি ৬১ লাখ লোক এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন সাড়ে তিন কোটি লোক।

বিভিন্ন গণসচেতনতার মাধ্যমে যেখানে এইডস নামক মরণ ব্যাধিকে দূর করার জন্য বাংলাদেশে সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে মানুষদের সচেতন করে তোলা হচ্ছে। সেখানেই বর্তমানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা আগমনের কারণে বাংলাদেশে মরণব্যাধি এইডস রোগের ঝুঁকি বেড়েছে অনেক গুণ। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া বিপূল সংখ্যক রোহিঙ্গা মরণব্যাধি এইচআইভি ভাইরাস বহন করায় তাদের মাধ্যমে এদেশে এইডস রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশক্সকা দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ এ রোগ প্রতিরোগ আক্রান্তদের চিহ্নিতের পাশাপাশি আরও বেশি সচেতনতা তৈরির দাবি চিকিৎসকদের।

নতুন আর পুরনো মিলিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গার বাস। সম্প্রতি নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ৯৭ জনের শরীরে পাওয়া গেছে মরণব্যাধি এইডস রোগের ভাইরাস। এর মধ্যে ৩৩ পুরুষ, ৪৯ নারী, ১৫ শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এইচডস ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম মিয়ানমার। দেশটিতে এইডস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আড়াই লাখের ওপর এবং প্রতি হাজারে আটজনই এইচআইভি পজিটিভ তবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির মধ্যে এই সংক্রমণের পরিমাণ কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের থেকে এই সংক্রামণ ছড়িয়ে পড়তে পারে কক্সবাজারের বাসিন্দাদের মধ্যে। কক্সাবাজারের মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র ‘নোঙ্গর’ এর তথ্যমতে নতুন পুরোনো মিলে ১৪১ জন রোহিঙ্গার শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, তাঁদের ধারণা, রোহিঙ্গাদের মধ্যে আরও অনেক এইডস রোগী থাকতে পারে। এইডস নিয়ে ঝুঁকির তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমারের অবস্থান অনেক ওপের। দেশটিতে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি এইডস রোগী রয়েছে। তাঁরা বলেন, এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করা না গেল বাংলাদেশে এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। জানা গেছে মিয়ানমারে প্রতি ১ হাজার জনে ৮ জনের এইচআইভি পজেটিভ বলে ধরে নেওয়া হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে যে সংখ্যায় রোহিঙ্গা এসেছে, তাতে কমপক্ষে ৪ হাজার জনের এইডস থাকার কথা।

বাংলাদেশে এইডস রোগীর সংখ্যা ১২ হাজারের কাছাকাছি (১১ হাজার ৭০০ ) বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এদের মধ্যে চিহ্নিত হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো। তবে এই রোগে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির সংখ্যা জনসংখ্যার এক শতাংশ বা ১৬ লাখ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৭৭ হাজার ৭২৫ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। তাদের মধ্যে ৮৬৫ জনের মধ্যে এইচআইভি শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬৩৯ জন পুরুষ, ২১৩ জন নারী, ১৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের। ৬৩ জন রোহিঙ্গা নতুন করে এইডসে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও জানান মন্ত্রী। সবমিলিয়ে ১৯৮৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৮৬ জন।

এইচআইভি ভাইরাস আছে এমন কোনো ব্যক্তির দেহে ব্যবহৃত সুই ব্যবহার করলে আপনারও এইডস হতে পারে। মেডিকেল সেক্টর এবং ট্যাটু স্টুডিওতে এমনটা ঘটতে পারে। সুতরাং সিরিঞ্জ ব্যবহারের দরকার বা ট্যাটু করানোর দরকার হলে একবারে নতুন সুই বা সিরিঞ্জ ব্যবহার করুন।

মাদকসেবিরা সাধারণত সিরিঞ্জ ব্যবহার করে মাদক সেবন করেন। সেই একই সিরিঞ্জ একাধিক জনে ব্যবহার করলে এইচআইভি হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি আছে। কারণ কোনো একজনের যদি এইচআইভি থাকে তা অন্যদের দেহেও ছড়িয়ে পড়বে।এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির এইডস হতে পারে। এমনকি এইচআইভি আক্রান্ত লোকের দেহ থেকে একটি টিস্যু বা অঙ্গও এইডস ছড়াতে পারে। সুতরাং রক্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। অপরিচিত জনের সঙ্গে যৌন মিলন করলে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। কারণ যারা একাধিক মানুষের সঙ্গে যৌন মিলন করেন তাদের যৌনতাবাহিত রোগ হওয়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে।

কান বা নাক ফোড়ানোর সময় বা এই ধরণের কোনো ছিদ্র করার সময় ব্যবহৃত সুচ থেকেও সুতরাং একেবারে নতুন সুচ ব্যবহার করে এই ধরনের ছিদ্র করুন। যে মায়ের দেহে এইচআইভি আছে তার সন্তানেরও এইচআইভি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জন্মের আগের বা পরেও জন্মের পরে বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে এই সংক্রমণ ঘটে। তবে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে এই সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব।

আপনার যদি আগেও কোনো যৌনতাবাহিত রোগ হয়ে থাকে তাহলে আপনার এইডস হওয়ার ঝুঁকিও বেশি। কারণ আগের ত্বকে যে ক্ষত সৃষ্টি হয় তাতে এইচআইভি সহজেই দেহে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া যৌনবাতাহিত রোগ ত্বকে প্রদাহেরও সৃষ্টি করে যা সহজেই এইডসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

এইচ একটি মরণব্যাধি হওয়ায় এ সম্পর্কে মানুষের রয়েছে ব্যাপক ভীতি। এর বিপরীতে তেমনি রয়েছে ব্যাপক অজ্ঞতাও। আর এ অজ্ঞতার ফলে এইচআইভি বহণকারী ব্যক্তি বা এইডস আক্রান্ত রোগীকে একইসঙ্গে সামাজিকভাবেও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ হয়। এইডস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে এবং অযৌক্তিক ঘৃণার কারণে দুঃখজনক আর অমানবিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জীবন দিতে হয়েছে অনেক এইডস রোগীকে। কিন্তু বাস্তব হল, এইচআইভি ছোঁয়াচে নয় এবং শুধুমাত্র স্পর্শের মাধ্যমেই এইচআইভি এক শরীর থেকে অন্য শরীরে স্থানান্তরিত হতে পারে না । এ বিচারে, এইচআইভি বহনকারী ব্যক্তি অন্য সাধারণ ব্যক্তিদের মতোই স্বাভাবিক আচরণ প্রত্যাশা করতে পারেন।

যেহেতু এখন পর্যন্ত এইডসের কোন প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কার হয়নি এবং চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এইডস সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা, সে অনুযায়ী সচেতন হয়ে সুশৃঙ্খলা ও নিরাপদ জীবনযাপন করা। ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন কঠোরভাবে পালন করা উচিত। মনে রাখা উচিত, এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা শুধু এইডস হওয়ার সময়কে বিলম্বিত করে, পুরোপুরি নিরাময় করে না। জনগণের সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। এইচআইভি এবং এইডস শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যাই নয় বরং এটি একটি উন্নয়ন সমস্যা যা আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জাড়িত। তাই সরকার এবং অন্যান্য সামাজিক শক্তি ও সংগঠনকে সমম্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এইডস রোগীদের চিকিৎসা সুবিধা, প্রতিরোধ এবং এইডসে আক্রান্তদের প্রতি সামাজিক নিগ্রহ ও বৈষম্যমূলক আচরণ পরিহার করার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং এইডসে মৃত্যু শূূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রেও নতুন নতুন আবিষ্কার সত্ত্বেও এমন অনেক রোগ রয়ে গেছে যেগুলোকে আমরা এখনো জয় করতে পারিনি। শুধুমাত্র সতর্কতা এবং জ্ঞানই পারে আমাদেরকে এইডস রোগ থেকে রেহাই দিতে।

লেখক: সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান) চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব
সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি, গবেষক,শিক্ষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট