সভ্যতাবোধের অভাব ও হীন মানসিকতা থেকে হিংসা ও পরশ্রীকাতর রোগের উৎপত্তি

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা ইবলিসের ভূষণ।পরশ্রীকাতরতা সংকীর্ণতার সর্বোচ্চ ধাপ। ‘হাসাদ’ তথা হিংসা আত্মবিধ্বংসী বদগুণ। আরবি ‘হাসাদ’ শব্দের অর্থ হিংসা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি। পরিভাষায় অন্যের ভালো কিছু দেখে তা নষ্ট হওয়ার কামনা করাকে হাসাদ বলে। হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনার কথা স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন। ‘হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো, যখন সে হিংসা করে’ (সূরা ফালাক, আয়াত : ৬)। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) লেখেন, ‘পৃথিবীতে সর্বপ্রথম পাপ হলো হিংসা। পরশ্রীকাতরতা হলো মানব চরিত্রের একটি নিন্দনীয় স্বভাব। এর অর্থ হলো অন্যের উন্নতি ও সৌভাগ্য দেখে ঈর্ষা প্রকাশ করা। এটি এমন একটি মানসিক ব্যাধি যা মানুষের শান্তি বিনষ্ট করে। পরশ্রীকাতর বিশেষণ পদ পরের শ্রী ঐশ্বর্য বা উন্নতি দেখলে কাতর হয় এমন, ঈর্ষান্বিত। কারো ধন-দৌলত, সম্মান, ভালো ফল বা উচ্চ মর্যাদা দেখে ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং তার ধ্বংস কামনা করাকে পরশ্রীকাতরতা বলে।

অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করার বিষয়টিও আখলাকী বদ-অভ্যাসের মধ্যে শামিল। কোনো কারণে কারো প্রতি দুশমনীর ভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখার না বিদ্বেষ। অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা হারাম। হাদীসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, ‘‘ প্রতি জুমু’আর (সপ্তাহে) সোম ও বৃহস্পতিবার মানুষের আমলসমূহ পেশ করা হয় এবং সমস্ত মু’মিন বান্দাদের গুণাহ খাতা ক্ষমা করে দেওয়া হয়। কিন্তু যাদের পরস্পরের মদ্যে বিদ্বেষ ও দুশমনী আছে তাদেরকে ক্ষমা করা হয় না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তাদেরকে ছেড়ে দাও, যেনো তারা ফিলে আসে ,অর্থাৎ মিলে যায়। তিনি আরো বলেন, ‘‘ তিন ব্যক্তির গুণাহ মাফ হয় না। তন্মধ্যে একজন হচ্ছে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি।

আখলাখে সায়্যিআর মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের বিষয়টি মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যের সুখ-সম্পদ নষ্ট হয়ে নিজে এর মালিক হওয়ার কামনা করাকে হিংসা (হাসাদ) বলা হয়। অপরের প্রতি হিংসা করা হারাম। হিংসার বহু কারণ রয়েছে। যেমনঃ শত্রুতা, অহংকার, নিজের অসদুদ্দেশ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, নেতৃত্বের লোভ, কাক্সিক্ষত অনুগত লোকদের যোগ্যতাবান হয়ে যাওয়া এবং কোনো সুযোগ সুবিধা হাসিল হওয়া, ব্যক্তি বা খান্দানী-নীচুতা বা কার্পণ ইত্যাদি। এসব কারণে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির পতি হিংসা করে থাকে। ইসলামী শরী’আতে এগুলো সবই নিষিদ্ধ।

দুনিয়ার প্রথম মানব হযরত আদম (আ)-এর প্রতি আল্লাহর রহমত দেখে সে ঈর্ষায় ভোগে। আদম (আ)কে আল্লাহ যে মর্যাদা দেন সে তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। এ অস্বীকৃতি ইবলিসকে বিপথগামী করে। এভাবে সে অভিশপ্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই জগৎ-সংসারে যারা হিংসা, বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতায় ভোগে তারা প্রকৃত অর্থে ইবলিসের ঘৃণ্য পথকেই অনুসরণ করে।

আল্লাহ তা’য়অলা হিংসা থেকে পানাহ চাওয়ার জন্য কোরআন মাজীদে শিক্ষা দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে (পানাহ চাই) যখন সে হিংসা করে। (সূরা ফালাক) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে খানিকটা ক্ষোভ-হতাশা থেকে লিখেছেন, বাঙালি পরশ্রীকাতর। তিনি যৌবনেই স্থির নিশানা করেছেন- বাংলাদেশ হবে স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ। এ মহান লক্ষ্যে যারা আন্তরিকভাবে কাজ করায় আগ্রহী,উৎসাহী, তিনি তাদের পাশে পেতে চেয়েছেন। বাংলাদেশের আপামর মানুষ শুরু থেকেই তাঁর পাশে থেকেছে। কিন্তু মুষ্টিমেয় লোক তাকে যন্ত্রণা দিয়েছে; এগিয়ে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেরা জনগণের কল্যাণ সাধনে কিছু করতে চায় না; অন্যেরা করুক, সেটাও চায় না।

আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা অন্যের ভালো দেখতে পারে না। অন্যের খুশিতে এরা খুশি না হয়ে ঈর্ষান্বিত হয়ে তার অমঙ্গল কামনা করে। এটা মানুষের একটা বদ স্বভাব। এটা একটি মানসিক রোগ। রোগের নাম পরশ্রীকাতরতা। পর মানে অন্য আর শ্রী মানে সৌন্দর্য, কাতরতা মানে অসুস্থতা; অর্থাৎ অন্যের সৌন্দর্য দেখে যারা অসুস্থ হয়ে পড়েন তারাই পরশ্রীকাতর। কথাটার শব্দগত অর্থই বলে দেয় পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক অসুস্থতা বা রোগ। সভ্যতাবোধের অভাব ও মানসিক নীচতা থেকে এই রোগের উৎপত্তি। সাধারণভাবে মানুষ হিসেবে অন্যের ভালো দেখে আমাদের সকলেরই আনন্দিত হওয়ার কথা। এটাই মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক আচরণ। সমাজবদ্ধতার কারণে যুগে-যুগে মানুষ একে অন্যের সুখে সুখী, দুঃখে দুঃখী হয়ে এসেছে। এটাকে বলে সহমর্মিতা। যা না থাকলে মানুষের ‘মানুষ’ পরিচয় অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর পরশ্রীকাতর মানুষদের মধ্যে এই সহমর্মিতা একবারেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুতরাং একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মানুষ পরিচয় একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষের মন থাকবে আকাশের মতো উদার। পরশ্রীকাতরতার মতো সংকীর্ণতার সেখানে স্থান হওয়ার কথা নয়। সৃষ্টি জগতে মানুষের অবস্থান সবার ওপরে, যে জন্য আত্মমর্যাদাবোধের কারণেই মানুষকে তার মনুষ্যত্ব বহাল রেখে চলতে হয়। পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মনুষ্যত্ব বহাল থাকে না।
পরশ্রীকাতরতা একটি অপগুণ। লোভ-লালসার এ অপগুণ মানুষকে অমানুষে পরিণত করে। মানবিক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই পরশ্রীকাতরতা থেকে দূরে থাকতে হবে। এ খারাপ প্রবণতা মানুষকে অন্যায় পথে যেতে মদদ জোগায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের নিম্নস্তরের লোকদের সঙ্গে নিজেকে বিবেচনা করো। তাদের সঙ্গে তোমাদের তুলনা কর। আর তোমাদের উচ্চস্তরের লোকদের সঙ্গে নিজেকে কোনো দিনও তুলনা করো না। তাদের দিকে ভুলে তাকিও না।’ আর যতটুকু পেয়েছ, যাই পেয়েছ এতেই পরিতুষ্ট হয়ে আল্লাহর শোকর আদায় করো।

একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তি কারো ভালো কিছু দেখলে হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরে। তার মনে তখন তীব্র অশান্তি তৈরি হয়, যা তার নিজের জন্যই ক্ষতিকর। এছাড়া সকলের অমঙ্গল চাওয়ার অপরাধে তাকে প্রায় একঘরে হয়েই জীবন পার করতে হয়। অন্যের ক্ষতি চাইতে চাইতে এদের অন্তর তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে হাজার চেষ্টা করেও সেই আবদ্ধ তালা আর খুলতে পারে না। উদারতার অমৃত স্বাদ উপভোগের ক্ষমতা তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলে। অন্যের আনন্দে আনন্দিত হতে পারার মধ্যে যে কি স্বর্গীয় আবেশ, তা এদের কাছে চির অচেনাই থেকে যায়। যতদিন তারা বেঁচে থাকে, অন্য সকলের মত মানসিক প্রশান্তি তাদের অধরাই থেকে যায়। সকলের মাঝে থেকেও এরা থাকে বহু দূরের দ্বীপান্তর কিংবা বনবাসে।

পরশ্রীকাতরতা একটি মানসিক রোগ। অন্য সকল রোগের মতো এ রোগেরও যথাযথ চিকিৎসা রয়েছে। আসুন নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, আমি পরশ্রীকাতর কি-না। নিজেকে পরশ্রীকাতর মনে হলে উচিত হবে ধর্মীয় আচরণবিধি মেনে চলা, এর পাশাপাশি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা শুরু করা। আপাতত নিজের মনকে বলতে হবে পরশ্রীকাতরতা একটা বাজে স্বভাব; আমাকে অবশ্যই এই বাজে স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আপনার পাথরের মতো মনটা আস্তে আস্তে নরম করতে থাকুন। অন্য মানুষের সুখ-দুঃখ মন দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করুন। আত্মকেন্দ্রিতা থেকে বেরিয়ে এসে সহজ হয়ে সকলের সঙ্গে মেশার চেষ্টা করতে থাকুন। কারো ভালো সংবাদ শুনে খুশি হওয়ার চেষ্টা করুন। আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনি খুশি না হলেও কারো কিছু যাবে আসবে না। তাছাড়া খুশি না হলে আপনারও কোনো লাভ হচ্ছে না। কাজেই ঝক্কি-ঝামেলায় না গিয়ে আপনার বরং খুশি হলেই লাভ বেশি। কারণ, খুশি হলে মন ভালো আর মন ভালো হলে শরীরসহ সবই ভালো। আপনাকে বারবার স্মরণ করতে হবে আপনি সৃষ্টির সেরা (আশরাফুল মাখলুকাত) মানুষ; আপনি পশু নন। পশুদের মন থাকে সংকীর্ণ; মানুষের নয়।

পরশ্রীকাতরতা সভ্যতাবোধের অভাব ও মানসিক নীচতা থেকে এই রোগের উৎপত্তি। সাধারণভাবে মানুষ হিসেবে অন্যের ভালো দেখে আমাদের সকলেরই আনন্দিত হওয়ার কথা। এটাই মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক আচরণ। সমাজবদ্ধতার কারণে যুগে-যুগে মানুষ একে অন্যের সুখে সুখী, দুঃখে দুঃখী হয়ে এসেছে। এটাকে বলে সহমর্মিতা। যা না থাকলে মানুষের ‘মানুষ’ পরিচয় অর্থহীন হয়ে পড়ে। আর পরশ্রীকাতর মানুষদের মধ্যে এই সহমর্মিতা একবারেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুতরাং একজন পরশ্রীকাতর ব্যক্তির মানুষ পরিচয় একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

আল্লামা তাকি ওসমানির মতে, নবী করিম (সা.) এর ব্যবস্থাপত্র আমল করলে অন্তরে অল্পে তুষ্টি অর্জিত হবে এবং সান্তনা আসবে। পক্ষান্তরে নবীজির এ ব্যবস্থা উপেক্ষা করে কেউ যদি নিজের চেয়ে উচ্চস্তরের লোকদের দিকে নজর দেয়, তাহলে দুঃখ-কষ্টের মাঝে হাবুডুবু খেতে খেতে তার অন্তরে একদিন হিংসা এসে বাসা বাঁধবে। কারণ মানুষের অন্তরে যখন লোভী হয়ে ওঠে আর অন্যদের তার চেয়ে অগ্রসর দেখতে পায়, তখন সে অনিবার্যভাবে হিংসুক হয়ে ওঠে। লোভের সঙ্গে হিংসা ওতপ্রোতভাবে জড়িতো। আজকের সমাজে সবার আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে বিরামহীন গতিতে। ফলে এখন আর মানুষ হালাল-হারামের কোনো তোয়াক্কা করছে না। কারণ তারা ধরেই নিয়েছে, আমাকে যে কোনো প্রকারেই হোক না কেনো প্রতিযোগিতায় জিততে হবেই। ন্যায়-অন্যায় এতো কিছু চিন্তার সময় কোথায়? হালাল-হারাম যেভাবেই হোক হতেই হবে। তাই মানুষ আজ ধীরে ধীরে সুদ-ঘুষে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ধোঁকাবাজ আর ভেজালে জড়িয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত। মোট কথা, এখন হেনো অপকর্ম নেই যা সে করছে না। এর কারণ, তাকে প্রতিযোগিতায় জিততে হবে এবং যেভাবেই হোক কাঙ্খিতো জিনিসটি অর্জন করতে হবে। এগুলো হচ্ছে অল্পে তুষ্টি অর্জন না করার ভয়াবহ পরিণতি। এজন্যই নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘অল্পে তুষ্টি অর্জন কর। ওপর তলার দিকে ভুলেও তাকিও না।’ তাহলে লোভ বাড়বে, হিংসা বাড়বে।
তিনি আরো এরশাদ করেন, তোমরা অন্যের প্রতি মন্দধারণা পোষণ করা থেকে বেঁচে থাকবে। কেননা এরূপ ধারণা জঘন্যতম মিথ্যা। আর কারো দোষ-অনুসন্ধান করো না, কারো গোপনীয় বিষয় তালাশ করো না, একে অন্যকে ধোঁকা দিবে না , আর পরস্পর হিংসা করবে না, এক অপরের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করবে না এবং পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ করবে না,বরং সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই থাকবে।

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর নেয়ামতের কিছু শত্রু আছে। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন,আল্লাহর নেয়ামতের শত্রু কারা? রাসূল (সা.) বললেন, ‘হিংসুকরা। হিংসুক তো এজন্যই হিংসা করে আল্লাহ কেনো তার বান্দাকে অনুগ্রহ করেছেন’ (দাওয়াউল হাসাদ)।
পরশ্রীকাতরতা বা হিংসা একটি জটিল মানসিক ব্যাধি। হিংসা হলো অন্যের প্রাপ্ত সৌভাগ্য বা পুরস্কারকে মনে প্রাণে অপছন্দ করা এবং একান্তভাবে কামনা করা যে তার সৌভাগ্য, সম্পদ বা সম্মান যেনো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একজন ব্যক্তি যখন পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত হয়, তখন সে ছাড়া আর কারো ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করুন বা সৌভাগ্য দান করুন তা একান্তভাবে অপছন্দ করে।

পরশ্রীকাতরতা সকল দেশেই বিদ্যমান। আমাদের দেশেও পিছিয়ে নেই। দেশে এখন পরশ্রীকাতরতা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। কারো উন্নতি দেখলেই জ¦লে ওঠে। আত্নীয়, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এমনকি স্বল্প পরিচিত ব্যক্তির উন্নতিতেও বুকে তুষের আগুন জ্বলে। অনেক পরহেজগার, উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিও এই দোষ থেকে মুক্ত নন। অথচ তারা জানেনা যে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা বিদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত হয়। সে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভ সুচারুভাবে পতিপালন করা সত্ত্বেও বিদ্রোহী, কেননা সে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর প্রশ্ন তুলেছে। মানুষ হিংসার কারণে ভাইবোন, আত্মীয়, প্রতিবেশীর কল্যাণ কামনা করতে ব্যর্থ হয় তখন তার ঈমানও হালকা হতে থাকে। শুধুমাত্র এই পরশ্রীকাতরতার জন্য ঈমানের সাথে মৃত্যুও হতে পারে না। ইহকালেও অন্তর বিষাক্ত হতে হতে সে অসুস্থ হয়ে যায়, দিনের পর দিন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে।

তাই নিজে ভালো থাকতে হলে অন্যের ভালো চাইতে হবে আগে। আর এই ভালো চাওয়া নিজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুলে যান সামনের সারিতে আলোচিত ব্যক্তিটি ছিলো অনেক গরীব ঘরের কিংবা পিছিয়ে পড়া সমাজের কেউ। মনের সকল আবর্জনা দূর করে যার যার প্রাপ্য গুণের জন্য অভিনন্দিত করুন। দেখবেন এক স্বর্গীয় আনন্দে ও আলোয় অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে আছে।

পরশ্রীকাতরতা ও পরস্ত্রীকাতরতা এক বিষয় নহে। বর্তমানে সমাজে বিশেষ করে উচু তলায় ভদ্র সমাজে পরস্ত্রীকাতরতার প্রভাব ও প্রয়োগ অনেক বেশি, যা ধর্মহীন সমাজ ও আধুনিকতার প্রতিযোগীতায় দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে এখন মহামারী আকার ধারণ করে প্রায় পরিবারেই অশান্তির জাল বিস্তার করছে।

ধর্মহীনতার নামেও আধুনিকতা ও আকাশ সংস্কৃতির পভাব এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু তথাকথিত ভদ্র সমাজ ধর্মকেই কুসংস্কার মনে করে বিধায় পরস্ত্রীকাতরাতার প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলছে। পরাশ্রয় পরাশ্রয়ী বা পরাশ্রিত শব্দ থেকে পরশ্রীকাতরতার উৎপত্তি। আক্ষরিক বা অভিধানিক অর্থে পরশ্রীকাতরতার অর্থ যাহাই হউক না কেনো বিবেক যেখানে বন্ধী হয়ে যায় সেখান থেকেই পরশ্রীকাতরতার উৎপত্তি। সত্যকে সত্য বলে প্রকাশ না করা বা কোনোভাবে সত্যকে এড়িয়ে চলা অথবা প্রতক্ষ্য বা পরোক্ষভাবে নিজ অবস্থানকে ঠিক রাখা বা উপরস্থদের অনুকম্পা পাওয়ার জন্য “অন্যায়” বা “মিথ্যা”কে সমর্থন দেয়ার মন মানসিকতাই পরশ্রীকাতরতা।

চিকিৎসা শাস্ত্রমতে বিষন্নতা একটি রোগ। অন্যান্য নিন্দনীয় অভ্যাসের মতোই মিথ্যা বলা একটি অভ্যাস, মানুষ অভ্যাসের দাস এ কথাও বানী চিরন্তনের মতোই যুগ যুগ ধরে পরিক্ষিত। মিথ্যা বলা যেনো আনন্দগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে অনেক জীবজন্তু রয়েছে যাদের “মেরুদন্ড” নাই, বুকের ওপর ভর দিয়ে চলে। যেমন- শাপ (স্বর্প), কেচো, কুচলিয়া জাতীয় প্রাণী। কিছু সমাজে এমন মানুষ রয়েছে যারা “মেরুদন্ডহীন মানুষ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। অর্থে, বিত্তে, সম্পদ, বংশ মর্যাদা, শিক্ষা দীক্ষায় শীর্ষ স্থানে অবস্থান করেও উচু তলায় অনেক মানুষের ললাটে “মেরুদন্ডহীনের” তকমা লেগে আছে যা সমাজের মানুষের পক্ষ থেকে এ তকমা উপহার হিসেবে প্রদত্ব। যে মানুষ কর্তায় “ইচ্ছায়” কর্ম করে, কিন্তু কর্তার “ইচ্ছা” যদি নীতি বা আদর্শ ও বিবেক বহির্ভুত হয় তারপরও নির্বিচারে সম্পাদন করে তখন সমাজ বা গণমানুষ “মেরুদন্ডহীন” বলে তাকে আখ্যায়িত করে। পরশ্রীকাতর হওয়ার জন্য ধরাবাধা কোনো সীমারেখা নাই। বিষয়টি ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, তবে হারে হারে অনুভব করা যায়, এটা নির্ভর করে লোভ-লালসা ও মন মানসিকতার ওপরে।
আত্মবিশ্বাসী মানুষ কখনোই নিজের হিংসা-বিদ্বেষকে বাড়তে দেয় না। আশপাশের মানুষের কিংবা বন্ধু-বান্ধবের ভালো সংবাদে অনেকেরই পরশ্রীকাতরতা দেখা দিতে পারে। তবে তা যেনো বাড়তে না পারে সেজন্য নিজেকেই সতর্ক হতে হয়। ওসব নিয়ে চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ বন্ধ করার চেষ্টা করতে হয়। যে ফেসবুক পোস্ট, টুইট কিংবা সংবাদে আপনার পরশ্রীকাতরতা তৈরি হয়, সে সংবাদগুলো এড়িয়ে চলুন।

অনেকেই অন্যের উন্নতি কিংবা ভালো কোনো খবরে কষ্ট পান। এ ধরনের পরশ্রীকাতর মনোভাব হিংসা ও বিদ্বেষ তৈরি ছাড়াও নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করে। অযোগ্য ব্যক্তিরাই পরশ্রীকাতরতায় ভোগেন। অপরের মঙ্গলে তাদের গাত্রদাহ হয়। তারা কাজও করবে না আবার অন্যের কাজেও বাধা প্রদান করে থাকেন। যেমন গরু যখন ঘাস বা বিচালি খেতে অগ্রসর হয় তখন কুকুর ঘেউ ঘেউ করে গরুটির পথ রোধ করে। গরুটি ক্ষুধায় কষ্ট পেয়ে কুকুরকে বলে, আরে ভাই তুমি ঘেউ ঘেউ করে আমার পথ রোধ করছো কেন? হয় তুমি খাও না হয় আমাকে খেতে দাও। কুকুর ঘাস বা বিচালি খাবে না কিন্তু গরুকেও খেতে দিবে না। গরুকে খেতে না দিতে পারা বা বাধা প্রদান করতে পারাতেই যেনো কুকুরটির শান্তি।

পরশ্রীকাতরতায় যারা নিয়মিত ভোগেন তাদের নিয়মিত মানসিক চাপে পড়তে হয়। পরশ্রীকাতরতার কারণে তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায় এবং হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপেও প্রভাব পড়ে। এছাড়া মানসিক নানা সমস্যা তৈরি হয় এবং তাদের কর্মক্ষেত্র, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের ওপর এর প্রভাব পড়ে।এ সমস্যা সমাধানে নির্দিষ্ট বিষয়কে মেনে নেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। অপরের সব বিষয়ে মাথা ঘামানো বাদ দিতে হবে। উপেক্ষা করা শিখতে হবে, যেনো অপরের কোনো বিষয় আপনার মনের মাঝে প্রভাব ফেলতে না পারে।
সভ্যতাবোধের অভাব ও হীন মানসিকতা থেকে হিংসা ও পরশ্রীকাতর রোগের উৎপত্তি। অন্যের ভালো দেখে অন্তর্জ্বালায় ভোগা মুনাফিকের চরিত্র। আর এমন পরিবেশে মু’মিনের কর্তব্য হলো ধৈর্য অবলম্বন করা। এতে করে আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই সুন্দর ও সুখময় হয়ে উঠবে। তাই আসুন পরশ্রীকাতরতা পরিহার করে উপভোগ করি মানব জীবনের শ্রেষ্ঠত্ব। পরশ্রীকাতরতা দূর করতে হলে আপনাকে ইসলামিক জ্ঞান ও আল্লাহ ভীতি অর্জন করতে হবে। নবী করিম (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিবৃত্ত থাকবে। কেননা, হিংসা মানুষের নেক আমল বা পুণ্যগুলো এমনভাবে খেয়ে ফেলে, যেভাবে আগুন লাকড়িকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়।’ (আবু দাউদ)

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট