সমাজ সংস্কারক ও বৌদ্ধধর্মপ্রচারক প্রখ্যাত পন্ডিত অতীশ দীপঙ্কর

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলেন একজন প্রখ্যাত পন্ডিত যিনি পাল সাম্রাজ্যের আমলে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধধর্মপ্রচারক ছিলেন। ছোটবেলায় তাঁর নাম ছিলো আদিনাথ চন্দ্রগর্ভ। তিন ভাইয়ের মধ্যে অতীশ ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর অপর দুই ভাইয়ের নাম ছিলো পদ্মগর্ভ ও শ্রীগর্ভ। অতীশ খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেন। কথিত আছে তাঁর পাঁচ স্ত্রীর গর্ভে মোট ৯টি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তবে পুন্যশ্রী নামে একটি পুত্রের নামই শুধু জানা যায়।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বৌদ্ধ পন্ডিত, ধর্মগুরু ও দার্শনিক। দশম-একাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি পন্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৯৮০ খিষ্টাব্দে ঢাকার বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে এক রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কল্যাণশ্রী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। অতীশ দীপঙ্কর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন মায়ের কাছে। তিন বছর বয়সে সংস্কৃত ভাষায় পড়তে শেখা ও ১০ বছর নাগাদ বৌদ্ধ ও অবৌদ্ধ শাস্ত্রের পার্থক্য বুঝতে পারার বিরল প্রতিভা প্রদর্শন করেন তিনি। মহাবৈয়াকরণ বৌদ্ধ পন্ডিত জেত্রির পরামর্শ অনুযায়ী তিনি নালন্দায় শাস্ত্র শিক্ষা করতে যান। ১২ বছর বয়সে নালন্দায় আচার্য বোধিভদ্র তাঁকে শ্রমণ রূপে দীক্ষা দেন এবং তখন থেকে তার নাম হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বোধিভদ্রের গুরুদেব অবধূতিপাদের নিকট সর্ব শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেন।

১৮ থেকে ২১ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বিক্রমশীলা বিহারের উত্তর দ্বারের দ্বারপন্ডিত নাঙপাদের নিকট তন্ত্র শিক্ষা করেন। এরপর মগধের ওদন্তপুরী বিহারে মহা সাংঘিক আচার্য শীলরক্ষিতের কাছে উপসম্পদা দীক্ষা গ্রহণ করেন।ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি পশ্চিম ভারতের কৃষ্ণগিরি বিহারে গমন করেন এবং সেখানে প্রখ্যাত পন্ডিত রাহুল গুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বৌদ্ধ শাস্ত্রের আধ্যাত্নিক গুহ্যাবিদ্যায় শিক্ষা গ্রহণ করে ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ উপাধিতে ভূষিত হন। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি ‘শ্রোতা জরিপ’-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিলো-সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? ত্রিশ দিনের ওপর চালানো জরিপে শ্রোতাদের ভোটে নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ ২০জনের জীবন নিয়ে বিবিসি বাংলায় বেতার অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয় ২০০৪-এর ২৬শে মার্চ থেকে ১৫ই এপ্রিল পর্যন্ত। বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০জন বাঙালির তালিকায় ১৮তম স্থানে ওঠে আসেন অতীশ দীপঙ্কর। দার্শনিক অতীশ দীপঙ্কর, তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষের মন জয় করেছিলেন-তিব্বত থেকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত।

বাংলা এবং বাঙালীর গর্ব “অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান”-এর কথা আজ হয়তো অনেক বাঙালীরই আর মনে নেই । প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ সব বৌদ্ধিক গুরুদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব। কিন্তু বেশিরভাগ বাঙালীই তাঁর সম্পর্কে কোনোদিন জানার বিশেষ আগ্রহই প্রকাশ করেনি।কালের নিয়মে তিনি প্রায় হারিয়েই গেছেন তথাকথিত শিক্ষিত বাঙালী সমাজের মন থেকে। তাঁর জীবনী সম্পর্কে আমাদের সকলেরই বিশেষভাবে জানার দরকার আছে, তাহলেই আমরা তাঁর আসল মর্ম বুঝতে পারবো ।অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মকাল নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। তাঁর প্রকৃত জন্ম কোথায় এবং কত খ্রিষ্টাব্দে হয়েছিলো সেই নিয়ে আজও আছে বিতর্ক। মহা মহোপাধ্যায় সতীশ্চন্দ্র বিদ্যাভূষণ ও রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতানুসারে, পালযুগেই মগধের পূর্ব সীমান্তবর্তী প্রদেশ অঙ্গদেশের সামন্তরাজ্য সহোরে তাঁর জন্ম হয়েছিলো।

অতীশ দীপঙ্কর এমন একটি যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যখন হিন্দু ও বৌদ্ধ, দুটি বৃহৎ ধর্মই তান্ত্রিক প্রভাবে আচ্ছন্ন ছিলো। তাই অতীশের ধর্ম শিক্ষাও শুরু হয় তান্ত্রিক মতে তন্ত্রচর্চার মধ্যে দিয়েই। নালজোরপা ছেনপোর মতে অতীশের প্রথম তান্ত্রিক দীক্ষাগুরু আর কেউ নন, স্বয়ং তাঁর পিতা। অতীশের পিতা ছিলেন তন্ত্র-সাধক, পারিবারিক ইষ্ট দেবী ছিলেন আর্যতারা।তান্ত্রিক মতে অভিষেক হবার পরেও বালক চন্দ্রগর্ভের ধর্ম অনুসন্ধান, আরো বেড়ে গেলো। শুরু হয় বিভিন্ন গুরুর কাছে হীনযান ও মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা।
দীপঙ্কর তিব্বতের বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি তিব্বতী বৌদ্ধধর্মে প্রবিষ্ট তান্ত্রিক পন্থার অপসারণের চেষ্টা করে বিশুদ্ধ মহাযান মতবাদের প্রচার করেন। বোধিপথপ্রদীপ রচনাকে ভিত্তি করে তিব্বতে বকা’-গদাম্স নামে এক ধর্ম সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হয়। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। তিব্বতের ধর্ম, রাজনীতি, জীবনী, স্তোত্রনামাসহ তাঞ্জুর নামে বিশাল এক শাস্ত্রগ্রন্থ সংকলন করেন। বৌদ্ধ শাস্ত্র, চিকিৎসা বিদ্যা এবং কারিগরি বিদ্যা বিষয়ে তিব্বতী ভাষায় অনেক গ্রন্থ রচনা করেন বলে তিব্বতীরা তাঁকে অতীশ উপাধীতে ভূষিত করে।

অতীশ দীপঙ্কর ১০১১ খ্রিষ্টাব্দে শতাধিক শিষ্যসহ মালয়দেশের সুবর্ণদ্বীপে (বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ) গমন করেন এবং আচার্য ধর্মপালের কাছে দীর্ঘ ১২ বছর বৌদ্ধ দর্শনশাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অধ্যয়ন করে স্বদেশে ফিরে আসার পর তিনি বিক্রমশীলা বিহারে অধ্যাপনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। গুজ রাজ্যের দ্বিতীয় রাজাসহ কয়েক জন ভিক্ষুর হাতে প্রচুর স্বর্ণ উপঢৌকন দিয়ে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে তিব্বত ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানালে দীপঙ্কর সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এতে নিরাশ না হয়ে ব্যাং-ছুব-য়ে-শেস’-ওদ সীমান্ত অঞ্চলে সোনা সংগ্রহের জন্য গেলে কারাখানী খানাতের শাসক তাকে বন্দী করেন ও প্রচুর সোনা মুক্তিপণ হিসেবে দাবী করেন। ব্যাং-ছুব-য়ে-শেস’-ওদ তার পুত্র লহা-লামা-ব্যাং-ছুব-ওদকে মুক্তিপণ দিতে বারণ করেন এবং ঐ অর্থ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে তিব্বতে আনানোর জন্য ব্যয় করতে বলেন। লহা-লামা-ব্যাং-ছুব-ওদ গুজ রাজ্যের রাজা হয়ে গুং-থং-পা নামে এক বৌদ্ধ উপাসককে ও আরো কয়েক জন অনুগামীকে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানকে তিব্বতে আনানোর দায়িত্ব দেন। এরা নেপালের পথে বিক্রমশীলা বিহারে উপস্থিত হন এবং দীপঙ্করের সাথে সাক্ষাৎ করে সমস্ত সোনা নিবেদন করে ভূতপূর্ব রাজা ব্যাং-ছুব-য়ে-শেস’-ওদের বন্দী হওয়ার কাহিনী ও তাঁর শেষ ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করলে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অভিভূত হন।

অতীশ দীপঙ্কর অনেক সংস্কৃত এবং পালি বই তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করেন। দীপঙ্করের রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে বোধিপথপ্রদীপ, চর্যাসংগ্রহপ্রদীপ, সত্যদ্বয়াবতার, মধ্যমোপদেশ, সংগ্রহগর্ভ, হৃদয়নিশ্চিন্ত, বোধিসত্ত্বমণ্যাবলি, বোধিসত্ত্বকর্মাদিমার্গাবতার, শরণাগতাদেশ, মহযানপথসাধনবর্ণসংগ্রহ, শুভার্থসমুচ্চয়োপদেশ, দশকুশলকর্মোপদেশ, কর্মবিভঙ্গ,সমাধিসম্ভবপরিবর্ত, লোকোত্তরসপ্তকবিধি, গুহ্যক্রিয়াকর্ম, চিত্তোৎপাদসম্বরবিধিকর্ম, শিক্ষাসমুচ্চয় অভিসময় ও বিমলরত্নলেখনা উল্লেখযোগ্য।

১০২৫ সালে অতীশ ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন। বয়স তখন চুয়াল্লিশে পড়লো। বিক্রমশীলায় যাবার আগে বজ্রাসনে গিয়ে বহু তীর্থযাত্রী, সাধু এবং যোগীকে দয়া, ভালোবাসা ও চিত্ত জাগরণের দীক্ষা দিয়েছেন। একবার এক যোগী অতীশকে আসতে দেখে সঠিক পথ প্রার্থনা করলো। তিনি জানালেন, ‘দার্শনিক দৃষ্টিকোণে হীনযান আর মহাযানে কোনো ফারাক নেই। আছে কেবল চর্চায়’। এভাবে তার চেষ্টায় মিটিয়ে দিয়েছেন পান্ডিতদের মধ্যকার মতবিরোধ ও বিবাদ। ফলে তার জয়গান এবং খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিক। পালরাজা মহীপালের আমন্ত্রণে বিক্রমশীলা মহাবিহারে স্থবির হিসাবে যোগ দেন তিনি। বলা হয়, মহীপাল বৌদ্ধধর্মের চারটি মূলধারা থেকে সাতান্নজন পন্ডিতকে আহবান করেছিলেন মধ্যবর্তী সন্দেহ ও বিরোধ মীমাংসার জন্য। স্পষ্ট দেখতে পেলেন সুমাত্রা ফেরত পন্ডিত চন্দ্রগর্ভের জ্ঞানের ধারে কাছেও কেউ নেই। প্রসন্ন মহারাজ এইবার তাকে “অতীশ” উপাধি দেন; প্রকৃতপক্ষে এখান থেকেই তিনি অতীশ বলে পরিচিত হতে শুরু করেন। অর্থাৎ ‘অতীশ’ এবং ‘দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান’ দুটোই তাঁর উপাধি।

বৌদ্ধমত প্রচার ও সংস্কারে অতীশের অবদানকে এখনও স্মরণ করা হয় কৃতজ্ঞচিত্তে। বোধিপথপ্রদীপ নামক রচনাতে তিনি মাধ্যমিক মহাযান মতবাদের সাথে হীনযান এবং বজ্রযান মতবাদের সমন্বয় করেন। উল্লেখ করে যান সাধকের ক্রম অগ্রসরমান পথের বিবরণ। অতীশ দীপঙ্কর এক আজন্ম জ্ঞানচর্চাকারীর নাম। সেই শৈশব থেকে মৃত্যু অব্দি শিখিয়েছেন প্রেম, দয়া আর ত্যাগের বাণী। বিক্রমশীলা মহাবিহারে দরজার ডানপাশের নাগার্জুনের ছবি অঙ্কিত ছিল আর বামপাশে অতীশের। এ থেকে প্রমাণিত হয় জ্ঞানে তাঁর মর্যাদা নাগার্জুনের তুল্য বলে সেই সময়েই স্বীকৃত। বাংলার মাটিতে জন্ম নেয়া অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এমন এক প্রদীপ; যে আলোকিত করেছে গোটা প্রাচ্যকে। সার্থক অর্জন হলো স্বার্থহীনতা এবং শ্রেষ্ঠ যোগ্যতা আত্মনিয়ন্ত্রণ। মহানতম গুণ হচ্ছে অন্যের সেবা আর শ্রেষ্ঠ ধর্মানুশাসনের নাম নিরবিচ্ছিন্ন বৌদ্ধিক জাগরণ।

সফল ঔষধ নিজেকে সবকিছু থেকে মুক্ত রাখা এবং শ্রেষ্ঠ কর্ম দুনিয়াবি পথের অনুসরণ না করা। শ্রেষ্ঠ মঙ্গল হচ্ছে প্রশান্ত হৃদয় আর সর্বোত্তম প্রচেষ্টা হলো ফলাফল নিয়ে হাহুতাশ না করা। শ্রেষ্ঠতম ধ্যান হলো কিছু আকড়ে না ধরে যেতে দেয়া। আর দৃশ্যমানের মধ্য দিয়ে সত্যকে দেখতে পারাই শ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞা।

অতীশ দীপঙ্করের একটা নতুন জীবনী লেখেন নাগওয়াং নিমা। তিনি এটা লিখেছেন তিব্বতীয় উৎসগুলো ব্যবহার করে। বইটি সংশোধন ও সম্পাদনা করে সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশ করেন লামা চিম্পা। এতে একটা ঘটনার বিবরণ আছে এ রকম: অতীশ তখন তিব্বতের নেথাংয়ে থাকেন। এক সন্ধ্যাবেলা বিখ্যাত এক যোগী এলেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। যোগী কিছুক্ষণ আলাপ করে চলে যাওয়ার পর কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, উনি কে? অতীশ বললেন, ‘আমার পুরোনো বন্ধু মৈত্রী ভৃখোলি।’ এর কিছুক্ষণ পর অতীশ আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখছিলেন। দীর্ঘ রাত পর্যন্ত তিনি ওভাবেই তাকিয়ে থাকেন। পরদিন ভোরবেলা এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে অতীশ বললেন, ‘সে এক দারুণ দৃশ্য! মৈত্রেয়নাথ ও মঞ্জুশ্রী দেখা দিলেন আকাশে। দুজনের মধ্যে মহাযান মত নিয়ে আলাপ চলছে, বজ্রপাণি আছেন পাহারায় আর দেবপুত্রেরা চারদিকে বসা। আমি তাদের আলাপই শুনছিলাম। এবার পুরো আলোচনাটা লিখে ফেলতে হবে।’ কথা শেষ করে অতীশ লেখার জন্য ছুটলেন। এ ঘটনা থেকে অতীশের লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে আঁচ করা যায়, যেন মহাযান ধারার দার্শনিকদের নিজের সামনে বসিয়ে লিখছেন তিনি। মৈত্রেয়নাথ, নাগার্জুন, বোধিভদ্র, আর্যদেব, শান্তিদেব, শান্তরক্ষিত প্রমুখের দার্শনিক ধারার ভেতর দাঁড়িয়ে নিজের পথ খুঁজেছেন অতীশ। তাঁর সরাসরি শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানশ্রী মিত্র, অবধূতিপা, শীলরক্ষিত, আচার্য জেতারি, ডোম্বিপা, নারোপা, দানশ্রী, বোধিভদ্র, ধর্মকীর্তিসহ আরও অনেকে। কাজেই শ্রীজ্ঞান অতীশকে পাঠ করা মানে কেবল তাঁকেই পড়া নয়, তিনি যোগসূত্র হয়ে ওঠেন এমন একটা দার্শনিক ঘরানার, যা আমাদেরই চিন্তার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। অথচ নানা কারণে এই পরম্পরাকে আমরা প্রায় হারিয়ে ফেলেছি। অতীশের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত অনেকে এ দেশেরই দার্শনিক, যাঁদের আড়ালে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের মধ্যে আছেন আচার্য জেতারি, যিনি দশম শতকের যুক্তিবিদ, জন্ম বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলে। লামা তারনাথের বইয়ে তাঁর ২৩টি রচনার তালিকা পাওয়া যায়। অতীশকে অল্প বয়সেই তাঁর মা-বাবা এই আচার্যের কাছে বিদ্যাশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। অতীশ তাঁর কাছে শেখেন প্রাথমিক বিজ্ঞান। তবে আচার্য জেতারির কাজের প্রধান বিষয় ছিলো যুক্তিশাস্ত্র। হেতু-তত্ত্ব-উপদেশ এবং ধর্ম-ধর্মী-বিনিশ্চয় তাঁর দুটি গুরুত্বপূর্ণ বই। প্রথম বইটিতে তিনি ন্যায়-যুক্তির হেতুপদ নিয়ে এবং দ্বিতীয় বইয়ে সাধ্যপদ ও পক্ষপদ নিয়ে অন্বেষণ করেন। তিব্বতের প্রাচীন বইয়ের সংগ্রহশালা তাঞ্জুরে সংরক্ষিত এই বইগুলো অনূদিত হতে পারে বাংলায়।

প্রাচীনকালের পন্ডিত ও মহাচার্যদের মধ্যে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সর্বাধিক আলোকিত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। জীবনের শেষ সময়টা তিব্বতে কাটাবার ফলে বাঙালির স্মৃতির অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন তিনি। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ইতিহাসখ্যাত পন্ডিত, যিনি পাল সাম্রাজ্যের দশম ও একাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পন্ডিত হিসেবে স্বীকৃত। একইসঙ্গে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষু, দার্শনিক ও ধর্ম প্রচারক। বিদ্যা অর্জনের জন্য তিনি মগধ, সুমাত্রা ও শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ করেন। তিব্বতে গমনের আগে তিনি ইতিহাসখ্যাত বিক্রমশীলা, দন্তপুরী ও সোমপুর বিহারে দীর্ঘ দিন অধ্যাপনা ও আচার্যের দায়িত্ব পালন করেন।

অতীশের একটি রচনায় ‘বোধিসত্ত্ব ব্রত বিষয়ে কুড়িটি স্তবক’ নামে এক লেখার কথা আছে। এটি লেখেন দার্শনিক চন্দদাস। তিনি চন্দ্রগোমিন নামেই বেশি পরিচিত। জন্ম রাজশাহী অঞ্চলে। কিন্তু পরে বসতি গড়ে তোলেন দক্ষিণ বাংলার এক দ্বীপে। তাঁরই নামে ওই দ্বীপের নাম হয় চন্দ্রদ্বীপ, যা বরিশাল জেলার পূর্বনাম। অবশ্য আরেকজন চন্দ্রগোমিনের পরিচয় পাওয়া যায়, যাঁর বিবরণ আছে চীনা পরিব্রাজক ইৎ সিঙের লেখায়, যিনি চন্দ্রকীর্তির সময়ে জীবিত ছিলেন। অতীশ দীপঙ্কর চন্দ্রগোমিনের লেখা অনুবাদ করেন তিব্বতীয় ভাষায়। এ রকম একটি লেখার অন্তঃশ্লোকে চন্দ্রগোমিন সম্পর্কে অতীশ বলেন, ইনি কবিদের শিরোমণি এবং ভাষাতত্ত্ব

যুক্তিশাস্ত্র,দর্শন,আরোগ্যবিদ্যা ও শিল্প এই পঞ্চবিদ্যায় পারদর্শী।চন্দ্রগোমিনের বেশ কটি লেখা ইংরেজি ভাষায় পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে এই দার্শনিক অপরিচিতই রয়ে গেলেন। আরেকজন বিখ্যাত বৌদ্ধ যুক্তিবিদের লেখা উদ্ধৃত করেন অতীশ, তিনি আচার্য শান্তরক্ষিত, যাঁর জন্মও বাংলাদেশে—মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরে। অতীশের দুই শ বছর আগে তিনিও তিব্বতে গেছেন রাজা ঠিস্রোং দেচানের আমন্ত্রণে। শান্তরক্ষিতের গুরুত্বপূর্ণ একটা বই তত্ত্ব-সংগ্রহ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন গঙ্গানাথ ঝা। এ ছাড়া আরও ১০টি বইয়ের নাম আছে লামা তারনাথের বইয়ে। শান্তরক্ষিত এতো বড় দার্শনিক যে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর একটি পুস্তকে ‘তাঁকে বাংলার গৌরব’ বলে উল্লেখ করেন।

অতীশ দীপঙ্কর তাঁর ‘মধ্যপথের স্তোত্র’ শিরোনামের একটি লেখায় বলেন, একজন চক্ষুরোগী বাস্তবতাকে যেমন দেখে, তেমন দেখাকেই সে সত্য ভাবে, একইভাবে অবিদ্যাগ্রস্ত লোকও তার দেখা বাস্তবতাকেই সত্য ভেবে নেয়। এটা একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকট। এ থেকে বেরোনোর উপায় হলো ব্যক্তির রূপান্তর। এ লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি প্রবর্তন করেন লামরিম শিক্ষাপদ্ধতি, যাতে ধাপে ধাপে ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তন ঘটবে। ব্যক্তির এই রূপান্তরে ভূমিকা রাখবেন একজন গুরু বা ‘কল্যাণ মিত্র’ এবং এতে সহায়ক হবে সাধকের নিরন্তর মানসিক প্রস্তুতি, পঠনপাঠন ও জনহিতকর কাজ। বৌদ্ধ সহজিয়াদের গুরু যেমন অলঙ্ঘনীয়, অতীশের কল্যাণ মিত্র ঠিক তেমন নন, তিনি আলোকময়তার পথে কেবলই একজন পথপ্রদর্শক,মিত্র।

যাঁরা প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন এবং ভিক্ষু, যাঁরা মঠ কিংবা বিহারে বাস করেন, সাধারণ লোকদের ধারণা, তাঁরা ধর্ম ও বিদ্যাচর্চা, ধ্যান ও সমাধি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, সংসার তাঁদের চিন্তার বিষয় নয়। এটা একেবারেই ভুল ধারণা। সংসারে থাকা মানুষকে দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত করা মহাযান বৌদ্ধ সাধকদের প্রধান কর্তব্য। এটাই সর্বজনীন করুণা। এটা মহাযান বৌদ্ধ মতের নৈতিক অবস্থানের দিক। অন্য দিকটা হলো, জগৎ-সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করা। এই দুটো দিকের সমন্বয় ছাড়া কোনো সাধকের পক্ষে বোধিলাভ সম্ভব নয়। মানুষকে দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার কর্তব্য অতীশ সব সময় পালন করে গেছেন। রাজা নয়পালের সঙ্গে চেদীরাজ লক্ষ্মীকর্ণের যুদ্ধের সময় অতীশের উদ্যোগ এবং চেষ্টাতেই উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। অতীশ নেপালে অবস্থানকালে রাজা নয়পালকে চিঠি লিখে ন্যায্য পথে শাসন পরিচালনার উপদেশ দেন। সুবর্ণদ্বীপে অবস্থানকালেও সেখানকার রাজা গুরুপালকে বাস্তবতাসম্পর্কিত পথ দেখানোর জন্য তিনি লেখেন ‘দুই প্রকার সত্য প্রসঙ্গে ভূমিকা’ নামে একটি লেখা।

মহাসঙ্ঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথ তিনি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশ জন বৌদ্ধ ছাত্র নিয়ে বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) বজ যোগিনী গ্রামে গিয়ে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের বস্তুভিটা পরিদর্শন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ঢাকা জাদুঘরের তৎকালীন সহকারী কিউরেটর শ্রী গনেশ চক্রবর্তী।দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানে ‘নাস্তিক পন্ডতের ভিটায়’ দাঁড়িয়ে মহাসঙ্ঘনায়ক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন যে, অতীশের দেহভস্ম চীন থেকে বাংলাদেশে আনয়ন করবেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ এবং ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে মহাসঙ্ঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ দীপঙ্করের দেহভস্ম আনয়ন করার প্রসঙ্গে প্রস্তাব করেন। তখন বাঙলাদেশের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত না থাকার কারণে এই বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়নি। তবে বঙ্গবন্ধু সুসময়ে অতীতের বাঙালি শ্রেষ্ঠ অতীশের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন। তারপর তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে অতীশ দীপঙ্করের পবিত্র দেহভস্ম গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিদল চীনে গিয়ে উপস্থিত হন।

প্রতিনিধি দলের মধ্যে ছিলেন মহাসঙ্ঘনায়ক বিশুদ্ধানন্দ মহাথের, শ্রীমত শুদ্ধানন্দ মহাথের, জনাব এম, আসাফুদ্দৌলা, ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী, অধ্যাপক রণধীর বড়ু’ ও শ্রী অশোক রঞ্জন বড়ুয়া। চীন বৌদ্ধ সমিতির প্রদান মি. ঝাউ পূ চু বাঙালি অতীশের পবিত্র দেহভস্ম বাঙলাদেশের প্রতিনিধি দলের কাছে হস্তান্তর করেন। ১৯৭৮ সালের ২৮ জুন অতীশের দেহভস্ম স্বদেশে তেজগাঁও বিমান বন্দর দিয়ে ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে এসে পৌঁছে। পুনরায় অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তিব্বত ও চীন হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন।

তিব্বতের ধর্ম, ইতিহাস, রাজকাহিনী, জীবনীগ্রন্থ, স্তোত্রগাথা এবং সর্বোপরি তাঞ্জুর নামে বিশাল শাস্ত্রগ্রন্থ-সঙ্কলনে সে দেশের ধর্ম, ঐহিত্য ও সংস্কৃতির প্রায় সবগুলো মাধ্যমের মধ্য দিয়ে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ তিব্বতবাসীর কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন আজও। বিশেষ করে অতীত তিব্বতের কোনো আলোচনাই তাকে ছাড়া সম্ভব নয়। আচার্য পন্ডিত শ্রী দীপঙ্কর জ্ঞান অভিসময় বিভঙ্গ নাম: মহাপণ্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বজাসন বজ গীতি: মহাপন্ডিত শ্রী দীপঙ্কর জ্ঞান বোধি পথ প্রদীপ: মহাচার্য শ্রী দীপঙ্কর জ্ঞান বিমল রত্ন লেখ নাম: স্থবির মহাপন্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ইত্যাদি। তিব্বতী মহাগ্রন্থ তাঞ্জুরে সংরক্ষিত ঊনআশিটি গ্রন্থের একই সঙ্গে গ্রন্থকার ও অনুবাদক রূপে দীপঙ্করের নাম পাওয়া যায়। তাদের পুষ্পিকাতেও এই ধরনের বহু উদাহরণ পাওয়া যায়। এখানে আরো উল্লেখ্য যে প্রতিটি গ্রন্থের তিব্বতীয় ও মঙ্গোলীয় গ্রন্থসূচিতে গ্রন্থকাররূপে জোবেজে বা অতীশের নাম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাঞ্জুর ও কোর্দিয়ে-র গ্রন্থ তালিকার এই সাক্ষ্য থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এই গ্রন্থগুলিতে গ্রন্থকারের ভারতীয় নাম যেভাবে এবং যত বিশেষণেই ভূষিত হোক না কেন, তিনি অবশ্যই আমাদের আলোচ্য মহান দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান অতীশ।

অতীশ খুব সহজেই তিব্বতের সর্ব স্তরের মানুষকে আকর্ষণ করছিলেন। সেই সঙ্গে ‘বোধিপথপ্রদীপ’ও পরিবাহিত হতে থাকলো তাঁর শিষ্যদের মারফত। চতুর্দশ শতাব্দীতে সোংখাপা থেকে শুরু করে আজকের পরমপূজ্য দলাই লামা পর্যন্ত, ‘বোধিপথপ্রদীপ’-এর প্রচারের উত্তরাধিকার সুসংরক্ষিত; এখনো এই গ্রন্থপাঠ হয়ে চলেছে। অতীশের ‘বোধিপথপ্রদীপ’কে ভিত্তি করে, আচার্য সোংখাপা পরে ‘বিয়াং চুব লাম রিম চেনমো’ নামে একটি বহুখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন, যেখানে বোধিলাভের পথের পবিত্র ধাপগুলি ব্যাখ্যা করা আছে। তিব্বতি পন্ডিতদের লেখা ‘বোধিপথপ্রদীপ’-এর ২০টি ভাষ্য এখনো পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের ভাষ্যরচনার ধারাটি একবিংশ শতাব্দী ছুঁয়ে বয়ে চলেছে। এক বার কয়েক জন তিব্বতি শিষ্য অতীশের কাছে এসে দর্শন-শিক্ষার প্রার্থনা জানালেন। অতীশ বললেন, ‘দার্শনিক ধারণা, সে তো অসীম, অনন্ত। তোমরা বরং সেই সারসত্যের (বংংবহপব) ধ্যান করো।’ শিষ্যরা বললো, কী ভাবে করবো? অতীশ উত্তর দিলেন, ‘ষড়রাজ্যের সমস্ত অনুভবী জীবের প্রতি করুণা রাখো। তাদের অসহনীয় দুঃখ দেখে যেনো তোমাদের বোধিচিত্ত জাগ্রত হয়। সমগ্র অন্তঃ ও বহির্ঘটনাকে মায়া বোধে ধ্যান করো। জগতের সমস্ত প্রাণের সঙ্গে একচিত্ত হয়ে সমস্ত কর্ম উৎসর্গ করো। এ ভাবেই সারসত্যে মন কেন্দ্রীভূত হবে।’ ‘বোধিপথপ্রদীপ’-এ অতীশ বুদ্ধের সমগ্র বাণীকে সংক্ষেপে ধরেছিলেন। তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের শুদ্ধিকরণ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসামান্য।

পরমপূজ্য দলাই লামা ও বিশ্ব জুড়ে বহু বৌদ্ধ পন্ডিতের অসংখ্য রচনার মধ্য দিয়ে অতীশেরই উত্তরাধিকার চলেছে।তাঞ্জুরে সংরক্ষিত দীপঙ্করের রচনাবলীর মধ্যে যে গ্রন্থগুলির তিব্বতী তর্জমায় তিনি নিজে অংশ নিয়েছিলেন তার সংখ্যা ঊনআশিটি। তারমধ্যে কয়েকটি রচনার নাম হলো-১. অভিসময়-বিভঙ্গ, ২.অমৃতোদয়-নাম-বালবিধি,৩. অক্ষোভ্য-সাধন, ৪.অষ্টভয় ত্রাণ, ৫. আপত্তি-দেশনা-বিধি, ৬. আর্য-অচল-ক্রোধ-রাজ স্তোত্র, ৭. আর্য-অবলোকিত-লোকেশ্বর-সাধন, ৮. আর্য-গণপতি-রাগ-বজ সময় স্তোত্র, ৯. আর্য-তারা-স্তোত্র, ১০. আয়ুঃ -সাধন, ১১. এক-স্মৃতি-উপদেশ, ১২. কর-বিভঙ্গ, ১৩. কর্ম-আবরণ-বিশোধন-বিধি-ভাষ্য, ১৪. কায়বাক্-চিত্ত-সুপ্রতিষ্ঠা, ১৫. থসর্পন-অবলোকিত-সাধন, ১৬. গর্ভ-সংগ্রহ, ১৭. চর্যা-গীতি-বৃত্তি, ১৮. চর্যা সংগ্রহ-প্রদীপ, ১৯. চিতা-বিধি, ২০. চিত্তোত্পাদ-সম্বর-বিধি-ক্রম ২১. জল-বলি-বিমল-গ্রন্থ, ২২. তারা-ভট্টারিকা-সাধন, ২৩. দশ-অকুশল-কর্ম-পথ-(দেশনা), ২৪. দীপঙ্কর-শ্রীজ্ঞান-ধর্ম-গীতিকা, ২৫. দেব-পূজা-ক্রম ।

বঙ্গদেশে কখনো বৌদ্ধধর্ম প্রচার হয়েছিলো তার সঠিক তথ্য এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে অনুমান করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধের সময়কাল হতেই সদ্ধর্মের আলো অবিভক্ত বাংলায় বিকীর্ণ হয়েছিলো। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. নীহার রঞ্জন রায় প্রমুখ মনে করেন, অশোকের আগেই বৌদ্ধধর্ম প্রাচীন বাংলায় কোনো কোনো স্থানে বিস্তার লাভ করেছিলো। নলিনীনাথ দাশগুপ্ত মনে করেন, মগধ ও বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান এত কাছাকাছি যে, বুদ্ধের জীবিতকালেই মগধ হতে বৌদ্ধধর্মের ঢেউ এসে বাংলাকে প্লাবিত করা মোটেই অসম্ভব নয়। পরবর্তীতে খৃষ্টপূর্ব ৩য় শতকে সম্রাট অশোকের ধর্মাভিযানের সময় তা আরো বিস্তার লাভ করে। যদিও বা অশোক কর্তৃক ধর্মদূত প্রেরিত দেশসমূহের তালিকায় বঙ্গের নাম নেই। এছাড়া অশোকের কোনো শিলালিপিতেও (ধর্মলিপি) বঙ্গদেশের নাম পাওয়া যায়নি। তদুপরি, বৌদ্ধ ঐতিহ্য, পালি ও বৌদ্ধ সংস্কৃত সাহিত্য, প্রচলিত কিংবদন্তী, চৈনিক পর্যটকদের বিবরণ, ঐতিহাসিক ও গবেষকদের অভিমতের পরিপ্রেক্ষিতে এটা বলা যায় যে, বুদ্ধের সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতক থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতকের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম বঙ্গদেশে প্রচার লাভ করেছিলো এবং মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলো। পরবর্তীতে স্থানীয় রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি সমগ্র বঙ্গদেশে প্রধান ধর্ম হিসেবে সুদীর্ঘকাল ছিলো এবং এদেশের সমাজ, ধর্ম, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা প্রভৃতির সামগ্রিক বিকাশে অসীম অবদান রেখেছিলো কিন্তু কালের বিবর্তনে বৌদ্ধদের মধ্যে বুদ্ধের ধর্ম, শিক্ষা, দর্শন এবং অনুশীলনে বিভাজন-মতান্তর দেখা দিলে বঙ্গদেশও এর হাত থেকে রক্ষা পায়নি। প্রাক-গুপ্তযুগের মেদিনীপুর জেলার তমলুক থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে খরোষ্ঠী-ব্রাহ্মী অক্ষরে উৎকীর্ণ একটি অস্থিখন্ড।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একটি নাম,একটি দিগন্তজোড়া ইতিহাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সব মানুষ বিশেষ করে তিব্বতের গণমানুষের কাছে তিনি সহস্রাধিক বছর ধরে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় দেদীপ্যমান। তার অমৃততম অহিংসার মর্মবাণী ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়ে তিব্বত তথা চীনের জনগণের জাতীয় জীবনে বিশাল দিগন্ত মেলে দেয়। প্রশান্তির ও প্রগতির প্রলেপ বিলিয়ে দেয়। আজও অতীশের অহিংসার বাণী, প্রেম-প্রীতি ভালোবাসার শিক্ষা, ক্ষমা, দয়া ও মানবতার আহ্বান শুধু বাংলাদেশ কেনো গোটা বিশ্বকে শান্তিময়, সম্প্রীতিময় ও প্রশান্তময় করে তুলতে পারে। হাজার বছর আগে জ্যোতির্ময়ী এ মহাজ্ঞানী, মহাজন এমনটাই করে গেছেন। অতীশ নেই। কিন্তু তার অমর অমিয় বাণী, তার শিক্ষা আর চেতনা হারিয়ে যায়নি। তার লেখা বিশাল গ্রন্থমালা আজও সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত। অতীশ তার কৃতিত্বে, কর্মে বিদ্যমান। এশিয়া জুড়ে সারা জীবন বিরামহীন চলার পথে পথে, পাহাড়ে পর্বতে, উপত্যকায়, সমতল প্রান্তরে, সাগরের বেলাভূমিতে, অরণ্যের বৃক্ষরাজিতে অতীশ ক্ষমা আর মানবতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আজ প্রয়োজন তাদেরই নতুন করে আবিষ্কার। আজ প্রয়োজন অতীশ চেতনার, প্রয়োজন অতীশ শিক্ষা অবলম্বনের, অতীশ আদর্শ ধারণের।
একসময় অবিভক্ত বঙ্গদেশ ছিলো বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম প্রধান পীঠস্থান ও চর্চাকেন্দ্র। বঙ্গদেশে পাল বংশের প্রায় চারশো বছরের রাজত্বে বৌদ্ধ ধর্ম এখানে বিস্তার লাভ করেছিলো। বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চট্টগ্রাম ছিলো বৌদ্ধ ধর্ম চর্চার মূল কেন্দ্র। বঙ্গের প্রাচীন নথি পুঁথিতে অবিভক্ত বঙ্গে বৌদ্ধ ধমের্রর প্রসারের কথা জানা যায়। কিন্তু কি কারণে বঙ্গদেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্ম ও বৌদ্ধরা নির্বাপিত হয়ে গেলেন,সেই রহস্যের উন্মোচন বড়ই সন্ধানী সন্ধান। বঙ্গের ইতিহাস লিখতে গেলে যেমন বঙ্গদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রসঙ্গ উঠে আসে অনুরূপ অবিভক্ত বঙ্গের বৌদ্ধধর্ম আলোচনায় বঙ্গদেশের ইতিহাস সম্পর্কেও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উঠে আসা স্বাভাবিক।

পাশাপাশি বঙ্গের ইতিহাস পর্যালোচনায় বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টি-সংস্কৃতি-জীবনধারার ক্রমবিকাশে বৌদ্ধধর্ম-সংস্কৃতির ব্যাপক ভূমিকাও রয়েছে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাব সাম্প্রতিক কালের ঘটনা হলেও বর্তমানের স্বাধীন বাংলাদেশ এবং পূর্বের অবিভক্ত বঙ্গ একটি প্রাচীন সভ্যতার আবাসভূমি। সুপ্রাচীনকাল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে বাঙালি জাতির উৎপত্তি হয়েছে। যথা-আদি অস্ট্রেলীয়, মঙ্গোলীয়, দ্রাবিড়, আর্য বা ইন্দোআর্য, শক, আরব, ইরানি, আবিসিনীয়, তুর্কি, আফগান, মুঘল, পর্তুগিজ, মগ প্রভৃতি নরগোষ্ঠীর রক্ত বাঙালির ধমনীতে প্রবাহিত বলে অনুমান করা হয়। আবার এ কারণে অনেকে ‘বাঙালি জাতি সঙ্কর জাতি’ হিসেবে মন্তব্য করেন। বঙ্গদেশের মূল অংশ বঙ্গোপসাগর থেকে জেগে উঠেছে।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এর কিছু অংশে মানব বসতির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থ ‘মহাভারত’ মতে দীর্ঘতমা মুনি বলিরাজের অনুমতিক্রমে সুদেষ্ণার গর্ভে পাঁচটি সন্তান অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম। তন্মধ্যে ‘বঙ্গ’ নামক সন্তান বঙ্গদেশের পত্তন করেছিলেন। তবে বঙ্গ-রাজার রাজত্বের কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। এর পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী রাজারা একালের বঙ্গদেশে (অখন্ড বাংলা) এক সময় রাজত্ব করত তার নমুনা পাওয়া যায় প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারগুলোর সূত্রে। এখন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা অনুসারে ‘উয়ারী-বটেশ্বর’ নমুনাকেই প্রাচীনতম নমুনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন অনুযায়ী বাংলাদেশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছিলো প্রায় ৪ হাজার বছর আগে। ধারণা করা হয় দ্রাবিড় ও তিব্বতীয়-বর্মী জনগোষ্ঠী এখানে সেসময় বসতি স্থাপন করেছিলো। পরবর্তীতে এই অঞ্চলটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয় এবং স্থানীয় ও বিদেশী শাসকদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে।

৯৯৪ সালে বোধিভদ্রের কাছে পৌঁছান অতীশ। রপ্ত করেন চিত্তকে জাগরিত করার শাস্ত্র। বিদ্যাকোকিলের থেকে শূন্যবাদ এবং কৃষ্ণগিরির অভধুতিপের কাছে তন্ত্র ও মহাযান বৌদ্ধ মতবাদে সমৃদ্ধ হন। কর্মচক্রের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম ধারণাগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠে তার কাছে। হৃদয় উন্মোচিত হয় ধর্মের প্রতি। আঠারো বছর বয়স অব্দি এখানেই ছিলেন। রপ্ত করেন হীনযানী ত্রিপিটক, বৈশেষিক দর্শন, মহাযানী ত্রিপিটক, মাধ্যমিক ও যোগাচারীদের অধিবিদ্যা। বৌদ্ধধর্মের অনুধ্যানিক বিজ্ঞান এবং গুঢ়তত্ত্ব তাকে আকৃষ্ট করেছে বিশেষভাবে।

এই জন্যই যান কৃষ্ণগিরি বিহারের রাহুলগুপ্তের কাছে। একজন রাজপুত্রকে এভাবে দুনিয়াবি সম্পত্তির সাথে সংশ্রবহীন অবস্থায় দেখে রাহুলগুপ্ত বিস্মিত হলেন। পরম স্নেহে শেখালেন আধ্যাত্মিক চর্চা, যোগ, ভাষা এবং দৈব তত্ত্ব। একুশ থেকে উনত্রিশ বছর বয়স অব্দি চারটি প্রধান ঘরানার তন্ত্রসাধনা নিয়ে জ্ঞান লাভ করেন অতীশ। ধর্মকীর্তি ছিলেন বোধিচিত্তের শিক্ষক। প্রায় বারো বছর ধরে তার কাছে থেকে সকল প্রকার মহাযানী প্রশিক্ষণ লাভ করলেন। শিক্ষা নেন বিশেষ ধ্যানের, যার মধ্য দিয়ে নিজের ভেতরে থাকা নেতিবাচক শক্তিকে প্রীতিময় শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। দয়া আর প্রেমের এই পাঠ বদলে দিয়েছিল অতীশকে। অতঃপর শিলং হয়ে ভারতে ফিরে আসেন। সাথে আনেন ধর্মকীর্তির রচিত সাতটি পান্ডুলিপি।

অতীশ দীপঙ্কর জন্মেছিলেন প্রায় এক হাজার ৪০ বছর আগে আজকের বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার বজ্রযোগিনী গ্রামে। বাবা ছিলেন গৌড়ীয় রাজ পরিবারের রাজা কল্যাণশ্রী, মা প্রভাবতী। বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন চর্চ্চা এবং প্রচার প্রসারের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়া জুড়ে স্মরণীয় অতীশ দীপঙ্কর। তাঁর প্রভাব আজও বিরাজ করছে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে। বৌদ্ধ ধর্মে সংস্কারের মতো শ্রমসাধ্য কাজ করতে করতে দীপঙ্করের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে ১০৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ৭৩ বছর বয়সে লাসা নগরের কাছে চে-থঙের দ্রোলমা লাখাং তারা মন্দিরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

লেখক, সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ(কারাতে ব্লাক বেল্ট ১ম ড্যান)
গবেষক,সাংবাদিক,কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব, মানিকগঞ্জ