সামাজিক শান্তি বিধ্বংসী একটি ঘৃণ্য অপরাধ হলো গীবত বা পরনিন্দা

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
গীবত অর্থ পরনিন্দা। কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষ-ত্রুটি আলোচনা করা। হতে পারে দোষটি তার মধ্যে আছে। কিন্তু এই আলোচিত দোষটির কথা শুনলে সে নির্ঘাত মনে ব্যথা পাবে তাহলে এটাই গীবত। হাদীস শরীফে এক সাহাবীর কথা এসেছে, যিনি নবীজী-কে প্রশ্ন করেছিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! গীবত কী? নবীজি উত্তরে বলেছিলেন, আপন ভাইয়ের আলোচনা তার পেছনে এমনভাবে করা যা তার নিকট পছন্দনীয় নয়। অর্থাৎ সে পরবর্তীতে যদি জানতে পারে তার সম্পর্কে অমুক মজলিসে এ আলোচনা হয়েছে তাহলে মনে কষ্ট পাবে এটাই গীবত।
গীবত আরবী শব্দ। আভিধানিক অর্থ অন্যের দোষ-ত্রু’টি প্রকাশ করা,অসাক্ষাতে দুর্নাম করা, কুৎসা রটনা করা ইত্যাদি। গীবতের পরিচয় প্রসঙ্গে রাসূল (সা:) বলেছেন, তোমরা ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে এমন কিছু উল্লেখ করা যা শুনলে সে অপছন্দ করবে তাই গীবত।
বস্তুত কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা যা শুনলে সে অসন্তুষ্ট হয়, তাকে গীবত বা পরনিন্দা বলে। গীবত বাচনিক অথবা লেখনীর মাধ্যমে অথবা অঙ্গ-প্রতঙ্গের ইশারা ইঙ্গিতে কিংবা অন্য যে কোনো উপায়েই বর্ণনা করা হোক এবং সে ব্যক্তি মুসলমান অথবা অমুসলিম হোক সর্বাবস্থায় গীবত ঘৃণ্য কাজ। যদি এমন দোষ-ত্রুটি করা হয়, যা ঐ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যায় না, তবে তা মিথ্যা অপবাদ হিসেবে গণ্য হবে।
নবী করিম (সা:) আরো বলেছেন, গীবত হচ্ছে, তুমি অপর ব্যক্তির এমন দোষ ক্রুটি বর্ণনা করছ যা প্রকৃত পক্ষেই তার মধ্যে বিদ্যমান আছে। ইমাম গাযালী বলেন, গীবত হচ্ছে তুমি তোমার ভাইয়ের দোষ ত্রু’টি এমনভাবে উল্লেখ করলে যে, তা যদি তার কানে পৌছে তবে সে তা অপছন্দ করবে।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনীর মতে, গীবত হচ্ছে কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা যা শুনলে সে চিন্তান্বিত হবে। তা সত্য হলেও। আর সে কথা মিথ্যা হলে তার নাম অপবাদ। আল্লামা রাগিব ইস্পাহানীর মতে, নি®প্রয়োজনে কোনো ব্যক্তির দোষ প্রকাশ করা হচ্ছে গীবত।
আজকের সমাজের অন্য এক শ্রেণির লোকের মতে যে দোষটি অন্যের জানা নেই, সে ধরণের দোষ ত্রুটি বর্ণনা করা গীবত। কিন্তু যা সকলে জানে তা বর্ণনা করা গীবত হবে না। তাদেরকে গীবত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা বলে, এটা গীবত নয়। কেননা আমি যা বলছি, তা সবাই জানে। এটা গীবত হয় কি করে? আসলে এটাও তাদের একটি ভ্রান্ত ধারণা। কেননা দোষ প্রকাশিত হোক বা গোপন হোক সব ধরণের দোষ বর্ণনা করাই গীবত। আর কারো গোপন দোষ বলে বেড়ালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দু’টো গুণাহ হবে। একটি গীবত করার গুণাহ, আর অন্যটি দোষ প্রচার ও প্রকাশ করার গুণাহ। গীবত বা পরনিন্দা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান। (১) মুসলমানের গীবত : এক মুসলমান অপর মুসলমানের গীবত করা সম্পূর্ণ হারাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন; তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমরা কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করো? আসলে তোমরা তা ঘৃণা করা। ২। যুদ্ধরত অমুসলিম শত্রুর গীবত ঃ ইসলামী আইন শাস্ত্রের গ্রন্থাবলী থেকে জানা যায় যে, অমুসলিম শত্রুর গীবত করা জায়েয। তাফসীরে কাবীরে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী সূরা হুজুরাতের ১২নং আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, কাফিরের গীবত করা জায়েয। সম্ভবত তিনি কাফির বলতে যুদ্ধরত শত্রু কাফিরদেরকেই বুঝিয়েছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালাই সর্বাধিক পরিজ্ঞাত। ৩। অমুসলিম নাগরিকের গীবত ঃ ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকের গীবত করাও হারাম। কেননা অমুসলিম নাগরিক ইসলামী রাষ্ট্রে মান-মর্যাদা ও ইজ্জত আবরু রক্ষার ক্ষেত্রে সমমর্যাদা সম্পন্ন। তাই এদের মান-সম্মানে আঘাত লাগে এরূপ গীবত করা হারাম। ৪। জীবিত ব্যক্তির গীবত ঃ জীবিত ব্যক্তির গীবত করা হারাম। ৫। মৃত ব্যক্তির গীবত ঃ মৃত ব্যক্তির গীবত করার হারাম। তদ্রুপ মৃত ব্যক্তিকে গালি দেয়া, মন্দ বলা, তার দুর্নাম-বদনাম করাও হারাম। যদিও সে জীবদ্দশায় পাপকর্মে লিপ্ত থাকে।
বিশ^ মানবতার দূত হযরত মুহাম্মাদ (সা:) বলেছেন, ‘‘তোমাদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে তাকে ছেড়ে দাও এবং তার গীবত করো না। আর তিনি গালি গালাজ প্রসঙ্গে বলেছেন ঃ তোমরা মৃতদেরকে গালি দিও না, কারণ তারা তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান পাওয়ার স্থলে পৌছে গেছে।’’
পবিত্র কোরআন কারীম ও হাদিস শরিফে গীবত সম্পর্কে কঠোর ভাষায় হুশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে বারবার। মহান আল্লাহ তা’য়ালা সূরা হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে এরশাদ করেন, ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা অনুমান থেকে দূরে থাকো। কেননা অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপের কাজ। তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না এবং একে অপরের পশ্চাতে গীবত করো না।’’
অনেকেই পরনিন্দাকে পাপ বা নিষিদ্ধ কোনো কিছু বলে মনেই করেন না। অথচ গীবত একটি জঘন্যতম পাপ। মদপান, চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার ইত্যাদি থেকেও মারাত্মক ও নিকৃষ্টতম। কেননা এসব পাপ তওবার দ্বারা ক্ষমা পাওয়ার উপযুক্ত। কিন্তু গীবতকারীর পাপ শুধু তওবা করলেই তা মাফ হবে না, বরং যার বিরুদ্ধে গীবত করা হয়েছে সে ব্যক্তি যদি মাফ করে তাহলেই আল্লাহর কাছে মাফ পাওয়া যাবে।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউই কারও গীবত করবে না। গীবত করলে তোমরা ধ্বংস হবে। ’ মহানবী (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা গীবত থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তাতে তিনটি ক্ষতি রয়েছে- ১. গীবতকারীর দোয়া কবুল হয় না, ২. গীবতকারীর কোনো নেক আমল কবুল হয় না ও ৩. আমলনামায় তার পাপ বৃদ্ধি হতে থাকে।
কোরআন ও হাদিসে গীবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যেভাবে মৃত ব্যক্তির গোশত কেটে ভক্ষণ করা হলে মৃত ব্যক্তির কোনো কষ্ট হয় না, তেমনি কারও গীবত করা হলে সে অনুপস্থিত থাকায় তারও কোনো কষ্ট হয় না। এভাবে মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ অত্যন্ত খারাপ ও নিকৃষ্ট কাজ, যা মানুষের রুচি বিরুদ্ধ। ঠিক গীবতও এ রকম।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘‘যখন তুমি কারও দোষ বর্ণনা করতে ইচ্ছা করো তখন নিজের দোষের কথা স্মরণ করো। যদি নিজের দোষ না দেখে শুধু অন্যের দোষই বর্ণনা করতে থাকো তাহলে আখেরাতে আল্লাহও তোমার দোষ প্রকাশ করবেন।’’
জাহান্নামে গীবতকারীদের দেহ থেকে গোশত ঝরে পড়বে। এক আয়াতে বলা হয়েছে,‘‘কঠিন শাস্তি ও দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে মানুষের নিন্দা করে থাকে। ’ প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, আগুন যতো দ্রুত শুষ্ক কাঠকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। গীবত তার চেয়েও অতি দ্রুত বান্দার নেক আমলগুলোকে ধ্বংস করে দেয়।’’
গীবত বা পরচর্চা নামাজ-রোজা বাদ দেওয়ার চেয়েও নিকৃষ্টতম। গীবত বর্তমানে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে গীবত করা জায়েজ যেমন- ১. অত্যাচারী জালেম শাসকের সম্পর্কে গীবত করা যাবে। ২. কারও দোষ দূর করার জন্য গীবত করাতে কোনো অসুবিধা নেই। ৩. কোনো ব্যক্তিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য বা পাপ কাজ থেকে লজ্জা দেওয়ার জন্য গীবত করা যাবে। ৪. কাউকে কোনো ভালো শিক্ষা ও সৎ পথে আনার উদ্দেশ্যে ওই ব্যক্তির গীবত করা যাবে। ৫. দ্বীন ইসলামের প্রতি উৎসাহী করার জন্য গীবত করাও বৈধ। ৬. কেউ যদি বিয়ের উদ্দেশ্যে কারও কাছে পাত্র বা পাত্রীর সম্পর্কে কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করে বা জানতে চায়। তাহলে নিয়ম হলো- দোষ-ত্রুটি থাকলে তা বলে দেওয়া। তা গীবত হবে না। কারণ ওই পাত্র বা পাত্রীর দোষ-ত্রুটি এখন না বললেও বিয়ের পরে যখন প্রকাশ পাবে তখন দাম্পত্য জীবনে অনেক ফেৎনা-ফ্যাসাদ ও ঝগড়া-বিবাদ হতে পারে।
গীবত একটি জঘন্য পাপ। আমরা দিবানিশি এই জঘন্য পাপে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকি। আল্লাহ আমাদেরকে হেদায়েত করুন। অনেকে গীবতকে বৈধতার পোশাক পরাতে চায়। বলে থাকে, আমি গীবত করছি না; বরং আমি কথাটি তার মুখের ওপরও বলে দিতে পারবো। সুতরাং এটা তার পেছনেও বলতে পারবো। জেনে রাখুন, গীবত গীবতই। মুখের ওপর বলতে পারা আর না পারার বিষয় এখানে বিবেচ্য নয়। কারো দোষ-ত্রুটি তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করলেই তার গীবত হবে। যা একটি কবিরা গুণাহ,মহাপাপ।
মদ পান, ডাকাতি এবং ব্যভিচার যেমনিভাবে কবিরা গুনাহ, অনুরূপভাবে গীবতও কবীরা গুনাহ। কবিরা গুণা হওয়ার দিক থেকে কোনো পার্থক্য এগুলোর মাঝে নেই। অন্যান্য কবিরা গুণাহর মতোই গীবতও নিঃসন্দেহে একটি হারাম কাজ। যেহেতু এটি হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হকের সাথে সম্পর্কযুক্ত। হাক্কুল ইবাদ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। যার সম্পর্কে ইসলামের বিধান হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মাফ না করা পর্যন্ত মাফ হবে না। অন্যান্য গুণাহ তাওবার মাধ্যমে মাফ হয়ে যায়। কিন্তু গীবতের বেলাযয় শুধু তাওবা যথেষ্ট নয়। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিও ক্ষমা করে দিতে হবে। কারো গীবত করবো না, কারো গীবত শুনবো না। কোনো মজলিসে গীবত শুরু হলে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো। অন্য প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করে দেব। আলোচনার মোড় পাল্টাতে না পারলে মজলিস ছেয়ে চলে যাব। যেহেতু গীবত করাও হারাম এবং শোনাও হারাম।
গীবত থেকে বাঁচার সহজ পদ্ধতি যেমন হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) বলেছেন, গীবত থেকে বেঁচে থাকার সহজ পদ্ধতি আছে। তা হলো অপরের আলোচনাই করবে না। ভালো কিংবা মন্দ সব আলোচনা থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। কারণ শয়তান খুব ধূর্ত। যখন কারো প্রশংসা শুরু করবে এবং তার গুণ ও উত্তম অভ্যাসগুলো আলোচনা করবে তখন শয়তান তোমার বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হবে। কোন ফাঁকে তোমার মগজে ঢুকিয়ে দিবে যে, আমিতো শুধু প্রশংসাই করে যাচ্ছি। তার ওই দোষও তো আছে; ওটা বলি না কেনো? তখন তোমার কথার ধরন পাল্টে যাবে। বলবে, অমুক ভালো তবে এই দোষটি তার মধ্যে আছে। এভাবে ‘তবে’ শব্দটিই তোমার সব শেষ করে দিবে। পুরো আলোচনাটা গীবতে পরিণত করে দিবে। তাই হাকীমুল উম্মত থানবী রহ. বলেন, যথাসম্ভব অপরের আলোচনা থেকে বিরত থাকবে। ভালো-মন্দ কোনো মন্তব্যের প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, একান্ত যদি করতে হয় তাহলে ভালো আলোচনাই করার জন্য কোমর বেঁধে বসবে। সতর্ক থাকবে শয়তান যেনো ভুল পথে নিয়ে না যায়।
সমাজের সকল অনিষ্টের মূল এটাই যে,আমরা নিজের প্রতি নজর দেই না। ভুলে গেছি, আমার কবরে আমাকেই থাকতে হবে। আমরা এসব কথা সম্পূর্ণ ভুলে বসেছি। তাই কখনো এর গীবত করছি, কখনো ওর গীবত করছি। কখনো এর দোষচর্চা করছি, কখনো ওর দোষচর্চা করছি। মোটকথা দিনরাত আমরা এ জঘন্য গুণাহে লিপ্ত আছি।
হাদিসে বর্ণিত,‘‘বান্দা যখন ভোরে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তখন শরীরের সব অঙ্গ জিহ্বার কাছে আরজ করে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ‘কে ভয় করো, আল্লাহর নাফরমানি কাজে পরিচালিত করো না। কেননা, তুমি যদি ঠিক থাক, তবে আমরা সঠিক পথে থাকবো। কিন্তু যদি তুমি বাঁকা পথে চলো, তবে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো। (তিরমিজি)
নবী করিম (সা.) বলেছেন,‘যে ব্যক্তি আমার জন্য তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।’ (বুখারি)
কোনো ব্যক্তি অভিনয়ের মাধ্যমে অপর ব্যক্তির দোষ ত্রুটির প্রতি ইঙ্গিত করলে তাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত।গীবত করার কারণ বা মানুষ যে সব ক্ষেত্রে গীবত করে থাকে মানুষ সব সময় নিজেকে বড় করে দেখে, এই আমিত্বের আরেক নাম আত্মপূজা। এটা শুরু হয়ে গেলে আত্মপ্রীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন তার আত্মত্যাগের মতো মহৎ বৈশিষ্ট্য দূরিভূত হতে থাকে। ফলে এ স্থানে দানা বাঁধে হিংসা-বিদ্বেষ। আবার হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই অপরের প্রতি কুধারণার সৃষ্টি হয়, যা মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে। সুতরাং আত্মপূজা, আত্মপ্রীতি, হিংসা-বিদ্বেষ, কুধারণাই মানুষকে গীবত করতে বাধ্য করে।
এই পৃথিবীতে বিভিন্ন কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তবে এসব কারণের ভেতরে অন্যতম একটি কারণ। এই গীবত ব্যক্তি, পরিবার, সমাজবিধ্বংসী একটি ব্যাধি। গীবতের কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়। সৃষ্টি হয় দূরত্ব। নিঃসন্দেহে গীবত করা গুণাহার কাজ। তবে গীবত শোনা এবং বাধা দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাধা না দেওয়াও অপরাধ। হযরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, “রাসূল (সা.) আমাদেরকে গীবত করা এবং গীবত শ্রবণ থেকে বারণ করেছেন”। (সীরাতে আহমাদিয়া)
অপর এক হাদিসে মহানবী (সা.) গীবতের পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, গীবত জেনা-ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক। কোনো ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু গীবতকারীকে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ মাফ করেন না, যতক্ষণ না যার গীবত করা হয়েছে তিনি ওই গীবতকারীকে মাফ করেন। (বায়হাকি)।
নিশ্চিত না হয়ে কারও সম্পর্কে মন্দ কিছু ধারণা করাও গীবতের অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের মন্দ ধারণাকে ইমাম গাযযালী আন্তরিক গীবত বলে অভিহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে কোরআন মজিদের সুরা হুজরাতের ৬নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘যদি তোমাদের কাছে কোনো ফাসিক কোনো খবর নিয়ে আসে, তা ভালোমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান করে নেবে।’ নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘‘আল্লাহ তা’য়ালা মুসলিমের রক্ত, ধনসম্পদ ও তার প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করাকে হারাম করেছেন।’’
গীবতকারী ও গীবত শ্রবণকারী উভয়ই সমান অপরাধে অপরাধী। হাদিসে আছে, সাহাবি মায়মুন (রা.) বলেন, ‘একদিন স্বপ্নে দেখলাম এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি একে কেনো ভক্ষণ করবো? সে বলল, কারণ তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি। সে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবত শুনেছো এবং সম্মত রয়েছে।’ গীবতকারী ও গীবত শ্রবণকারী উভয়ই সমান অপরাধে অপরাধী।
ইসলামের একটি মূলনীতি নবী করিম (সা.) বলে দিয়েছেন যে, ঈমানের দাবী হলো নিজের জন্য ওই জিনিস পছন্দ করবে যা অন্যের জন্য পছন্দ করবে। আর অপরের জন্যই জিনিস পছন্দ করবে যা নিজের জন্য করবে। অনুরূপভাবে নিজের জন্য তাই অপছন্দ করবে যাও পরের বেলায় অপছন্দ করো। এবার যদি আপনার অনুপস্থিতিতে কেউ আপনার দোষ-ত্রুটি ঘাটাঘাটি করলে আপনার অন্তরে ব্যথা লাগবে কি অবশ্যই।যদি তাকে খারাপ ভাবেন,আপনার দোষ চর্চার কারণে যদি সে খারাপ হয়ে যায় তাহলে আপনি এই কাজটিই অপরের জন্য করবেনথথতা কিভাবে ভালো হতে পারে! এটাতো দ্বৈতনীতি। নিজের জন্য এক নিয়ম অপরের জন্য আরেক নিয়ম। এরই নাম মুনাফেকি। গীবতের মধ্যে মুনাফিকি ও শামিল আছে।
আমাদের সমাজ ও পরিবেশ বড়ই নাজুক। এ সমাজে গীবত থেকে বেঁচে থাকা আসলেই কষ্টকর। তবে সাধ্যের বাইরে নয়। কারণ সাধ্যের বাইরে হলে আল্লাহ তা’য়ালা গীবত হারাম করতেন না। এ দ্বারা প্রতীয়মান হয়, গীবত থেকে বেঁচে থাকার শক্তি মানুষের আছে। সুতরাং আলোচনা যখন গীবতের পথে এগোবে তখন সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে ফিরে আসবে। গীবত ছাড়া অন্য আলোচনা করবে। এরপরেও যদি গীবত হয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে তওবা করবে, ইস্তেগফার করবে। ভবিষ্যতে গিবত না করার শপথ নিবে।
ইসলামে গীবত বা পরনিন্দা করাকে সম্পূর্ণরুপে হারাম বলে ঘোষণা করে তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে গীবত শোনাও অন্যায়। সুতরাং গীবত যে রকম পাপ, শ্রবণ করাও তেমনি পাপ। অথচ এই পাপের কাজটি চায়ের আসর থেকে শুরু করে স্বাভাবিক আলাপচারিতায় যেনো স্বভাবসুলভ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা যায়, এখন তো কোনো বৈঠক গীবত ছাড়া যেনো অসম্পূর্ণ থেকে যায়!
সামাজিক শান্তি বিধ্বংসী একটি ঘৃণ্য অপরাধ হলো গীবত বা পরনিন্দা। আল-কোরআনে গীবতকে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। আর হাদীসে একে ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ আজকাল অপরের দোষ চর্চা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরের দোষ চর্চা না করলে মনে হয় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কি যেনো প্রয়োজনীয় কাজটি বাদ পড়ে গেছে। গীবত এত গোণাহের কাজ হওয়া সত্ত্বেও আমরা গীবত পরিত্যাগ করিতে পারছি না, গীবত বর্জনের কোনো প্রচেষ্টাও করছি না। এর জন্য অবশ্য আমাদের অজ্ঞানতা, আমাদের অসচেনতা, অবহেলা ইত্যাদিই মূলত দায়ী।
হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘‘যারা গীবত করবে এরা ইহকালে যদিও ভালো ভালো নেক আমল করে, রোজা রাখে বা অন্যান্য ইবাদত করলেও এদের পুলসিরাত অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না। বরং তাদেরও বলা হবে- তোমরা গীবতের কাফ্ফারা না দেওয়া পর্যন্ত সামনে এগুতে পারবে না।’’ অথচ পুলসিরাত অতিক্রম না করে কারও পক্ষেই জান্নাতে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বোঝা গেলো, গীবতকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
গীবত সকল অনিষ্টের মূল। ঝগড়া-ফ্যাসাদ এ গীবতের কারণেই হয়। পরস্পর অনৈক্যের মূলও এটি। বর্তমান সমাজে যেসব বিশৃঙ্খলা দেখতে পাচ্ছি, এর জন্যও গীবত অনেকাংশে দায়ী। আল্লাহ না করুন, কেউ যদি মদ পান করে তাহলে সকলেই তাকে খারাপ ভাববে। দীনের সঙ্গে সামান্যতম সম্পর্ক আছে, এমন ব্যক্তিও তাকে ‘মন্দ’ ভাববে। সকলেই বলবে, এ তো পাপাচারে লিপ্ত। স্বয়ং মদপানকারীও নিজেকে ‘ভালো’ মনে করবে না। অদৃশ্য এক পাপ-যাতনায় সে সর্বদাই লিপ্ত থাকবে। পক্ষান্তরে, গীবতকারীর অন্তরে এরূপ কোনো অনুভূতি জাগে না। কেউ তাকে খারাপ মনে করে না। সুতরাং গীবত যে কতো বড় গুণাহ তা আমাদের অন্তরে এখনো আলোড়ন সৃষ্টি করেনি। জঘন্য, মারাত্মক ও অপবিত্র একটি কাজে আমরা লিপ্ত আছি; একথা আমরা আজও অনুধাবন করতে পারিনি। এর পরিণতির কথা আমরা একটুও ভাবি না। গীবতের হাকিকত সম্পর্কেও আমরা সম্পূর্ণ উদাসীন। অথচ মদ পান করার গুণাহ আর গীবতের গুণাহর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। মদ পান করা যেমন অন্যায় ও অপরাধ, অনুরূপভাবে গীবত করাও একটা অপরাধ। সুতরাং অন্তরে গীবতের মারাত্মক পরিণতি ও জঘন্য শাস্তির ভয় সৃষ্টি করতে হবে।
গীবতকে একটি হালকা এবং গুরুত্বহীন ব্যাপার বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটা বিপুল ক্ষতিকারক একটি বিষয়। এটা তাগুতী শক্তির একটি মারাত্মক অস্ত্র। দুষ্ট লোকজন কীভাবে গীবতকে ব্যবহার করে ছোট-বড় সামাজিক দূর্ঘটনা ও কোন্দল সৃষ্টি করে এবং সেসব দূর্ঘটনা ও কোন্দল থেকে অবশেষে নিজেরা ফায়দা উদ্ধার করে। একথা নিশ্চিত যে, যেই ব্যক্তি আপনার সামনে অন্যের দোষ সম্পর্কে বলে থাকে, কোনো সন্দেহ নেই সেই ব্যক্তি আপনার অনুপস্থিতিতে অন্যের সামনে আপনার দোষও বলাবলি করে থাকে। নেতিবাচক কিছু অভ্যাস, আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানুষ তার সম্ভাবনা বিকাশের পথটাকে রুদ্ধ করে দেয়। এই রকমই একটি নেতিবাচক আচরণ অভ্যাস- গীবত বা পরনিন্দা।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট