সামুদ জাতির গুরুত্বপূর্ণ একজন নবী হযরত ছালেহ (আ.)

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে সত্য দ্বীনসহ অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যাদের প্রেরণের মূল লক্ষ্যই ছিলো এ জমিনে তাঁর ইবাদাত তথা দাসত্ব মানুষকে শিখানো। মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় জুলুম অত্যাচার থেকে ফিরিয়ে সঠিক জীবন দর্শন দেখানো। তাই প্রত্যেক নবী-রাসূলই আল্লাহ তা’য়ালা এ মিশন বাস্তবায়নে নিজেদের এবং উম্মতের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ কামনায় দোয়া করেছেন। কোরানে বর্ণিত ২৫ জন নবী-রাসূলের মধ্যে হযরত সালেহ (আ.)অন্যতম।

ছালেহ (আ:) কুরআনের বর্ণনা অনুসারে,তিনি ছিলেন একজন নবী। সামূদ এক ইতিহাস-প্রসিদ্ধ জাতির নাম। এই জাতি ছিলো হযরত ছালেহ (আ) এর জাতি। তাদের পূর্ব-পুরুষ সামূদ এর নামানুসারে এ জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সামূদ-এর আর এক ভাই ছিলো জুদায়স। তারা উভয়ে আবির ইবনে ইরাম ইবনে সাম ইবনে নূহ এর পুত্র। আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পরে হযরত ছালেহ (আঃ) কওমে সামুদ- এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন। যাকে ‘সামূদ জাতির’ উদ্দেশ্যে আল্লাহ প্রেরণ করেছিলেন। কোরআনে মোট আট জায়গায় সালেহ এর আলোচনা করা হয়েছে। আর সালেহ এর সম্প্রদায় সামূদ জাতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে কুরআনের নয়টি সূরার মাঝে। কওমে ‘আদ ও কওমে ছামূদ একই দাদা ‘ইরাম’-এর দু’টি বংশধারার নাম। এদের বংশ পরিচয় ইতিপূর্বে হূদ (আঃ)-এর আলোচনায় বিধৃত হয়েছে। কওমে সামূদ আরবের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় বসবাস করত। তাদের প্রধান শহরের নাম ছিলো ‘হিজ্র’ যা শামদেশ অর্থাৎ সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। বর্তমানে একে সাধারণভাবে‘মাদায়েনে ছালেহ’ বলা হয়ে থাকে। ‘আদ জাতির ধ্বংসের পর ছামূদ জাতি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। তারাও ‘আদ জাতির মত শক্তিশালী ও বীরের জাতি ছিলো। তারা প্রস্তর খোদাই ও স্থাপত্য বিদ্যায় খুবই পারদর্শী ছিলো। সমতল ভূমিতে বিশালকায় অট্টালিকা নির্মাণ ছাড়াও পর্বতগাত্র খোদাই করে তারা নানা রূপ প্রকোষ্ঠ নির্মাণ করত। তাদের স্থাপত্যের নিদর্শনাবলী আজও বিদ্যমান রয়েছে। এগুলোর গায়ে ইরামী ও ছামূদী বর্ণমালার শিলালিপি খোদিত রয়েছে। অভিশপ্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে এলাকাটি আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। কেউ সেখানে বসবাস করে না। ৯ম হিজরীতে তাবূক যুদ্ধে যাওয়ার পথে মুসলিম বাহিনী হিজ্রে অবতরণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদেরকে সেখানে প্রবেশ করতে নিষেধ করে বলেন, ‘তোমরা ঐসব অভিশপ্তদের এলাকায় প্রবেশ করো না ক্রন্দনরত অবস্থায় ব্যতীত। যদি ক্রন্দন করতে না পার,তাহলে প্রবেশ করো না। তাহলে তোমাদের উপর ঐ গযব আসতে পারে,যা তাদের উপর এসেছিলো’। রাসূলের এই বক্তব্যের মধ্যে সুক্ষ্ম তাৎপর্য এই যে,এগুলি দেখে যদি মানুষ আল্লাহর গযবে ভীত না হয়,তাহলে তাদের অন্তর শক্ত হয়ে যাবে এবং ঐসব অভিশপ্তদের মত অহংকারী ও হঠকারী আচরণ করবে। ফলে তাদের উপর অনুরূপ গযব নেমে আসবে,যেরূপ ইতিপূর্বে ঐসব অভিশপ্তদের উপর নেমে এসেছিলো। পার্থিব বিত্ত-বৈভব ও ধনৈশ্বর্যের পরিণতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অশুভ হয়ে থাকে। বিত্তশালীরা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভুলে গিয়ে ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায়। সামূদ জাতির বেলায়ও তাই হয়েছিলো। অথচ কওমে নূহের কঠিন শাস্তির ঘটনাবলী তখনও লোকমুখে আলোচিত হতো। আর কওমে ‘আদ-এর নিশ্চিহ্ন হওয়ার ঘটনা তো তাদের কাছে একপ্রকার টাটকা ঘটনাই ছিলো। অথচ তাদের ভাইদের ধ্বংসস্তুপের উপরে বড় বড় বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করে ও বিত্ত বৈভবের মালিক হয়ে তারা পিছনের কথা ভুলে গেল। এমনকি তারা ‘আদ জাতির মত অহংকারী কার্যকলাপ শুরু করে দিল। তারা শিরক ও মূর্তিপূজায় লিপ্ত হলো। এমতাবস্থায় তাদের হেদায়াতের জন্য তাদেরই বংশের মধ্য হতে ছালেহ (আঃ)-কে আল্লাহ নবী মনোনীত করে পাঠালেন।

হযরত ছালেহ (আ.) যৌবনকাল থেকেই নিজ জাতিকে তাওহিদ তথা একত্ববাদের দাওয়াত দিতে শুরু করেন এবং এ কাজ করতে করতেই বার্ধক্যে উপনীত হন। আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে সঠিক পথে চলার দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য নবী ছালেহ (আ.)-কে মনোনীত করেন। কিন্তু অহংকারী ও দুর্নীতিবাজ লোকেরা তাঁর সাথে বিবাদ শুরু করে। তারা নবীর সদুপদেশ মানতে অস্বীকার করে। খারাপ লোকেরা হযরত ছালেহ (আ.)-কে বলে : ‘তুমি যাদুগ্রস্তদের অন্যতম। তুমি তো আমাদের মতো একজন মানুষ,কাজেই তুমি যদি সত্যবাদী হও, তাহলে একটি নিদর্শন উপস্থিত কর।’ সূরা শু’আরা : ১৫৩-১৫৪ ‘সামূদ সম্প্রদায় রাসূলগণকে অস্বীকার করেছিল। যখন তাদের ভাই সালেহ তাদেরকে বলল,তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তো তোমাদের জন্য একটি বিশ্বস্ত রাসূল।’(সূরা শু’আরা : ১৪১-১৪২)
পথভোলা জাতিকে হযরত ছালেহ (আঃ) সর্বপ্রথম তাওহীদের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাদেরকে মূর্তিপূজাসহ যাবতীয় শিরক ও কুসংস্কার ত্যাগ করে এক আললাহর ইবাদত ও তাঁর প্রেরিত বিধান সমূহের প্রতি আনুগত্যের আহবান জানালেন। তিনি যৌবনকালে নবুয়ত প্রাপ্ত হন। তখন থেকে বার্ধক্যকাল অবধি তিনি স্বীয় কওমকে নিরন্তর দাওয়াত দিতে থাকেন। কওমের দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা তাঁর উপরে ঈমান আনলেও শক্তিশালী ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঁকে অস্বীকার করে। ছালেহ (আঃ)-এর দাওয়াত সম্পর্কে সূরা আ‘রাফের ৭৩-৭৯ আয়াতে আল্লাহ বলেন,‘ছামূদ জাতির নিকটে (আমি প্রেরণ করেছিলাম) তাদের ভাই ছালেহকে। সে বলল, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হ’তে একটি প্রমাণ এসে গেছে। এটি আল্লাহর উষ্ট্রী, তোমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ। অতএব তোমরা একে ছেড়ে দাও আল্লাহর যমীনে চরে বেড়াবে। তোমরা একে অন্যায়ভাবে স্পর্শ করবে না। তাতে মর্মান্তিক শাস্তি তোমাদের পাকড়াও করবে’ (আ‘রাফ ৭/৭৩)। ‘তোমরা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে ‘আদ জাতির পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেন এবং তোমাদেরকে পৃথিবীতে ঠিকানা করে দেন। সেমতে তোমরা সমতল ভূমিতে অট্টালিকা সমূহ নির্মাণ করেছ এবং পাহাড়ের গায়ে খোদাই করে প্রকোষ্ঠ সমূহ নির্মাণ করেছ। অতএব তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ সমূহ স্মরণ কর এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করো না’ (৭৪) কিন্তু তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক নেতারা ঈমানদার দুর্বল শ্রেণীর উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোমরা কি জানো যে, ছালেহ তার প্রভুর পক্ষ হতে প্রেরিত নবী? তারা বলল, আমরা তো তার আনীত বিষয় সমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী’ (৭৫)।‘(জবাবে) দাদ্ভিক নেতারা বলল, তোমরা যে বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছ, আমরা সে বিষয়ে অস্বীকারকারী’ (৭৬)। ‘অতঃপর তারা উষ্ট্রীকে হত্যা করল এবং তাদের প্রভুর আদেশ অমান্য করল। তারা বলল,হে ছালেহ! তুমি নিয়ে এস যদ্বারা তুমি আমাদের ভয় দেখাতে, যদি তুমি আল্লাহর প্রেরিত নবীদের একজন হয়ে থাক’ (৭৭)। ‘অতঃপর ভূমিকম্প তাদের পাকড়াও করল এবং সকাল বেলা নিজ নিজ গৃহে সবাই উপুড় হয়ে পড়ে রইল’ (৭৮)। ‘ছালেহ তাদের কাছ থেকে প্রস্থান করল এবং বলল, হে আমার সম্প্রদায়! আমি তোমাদের কাছে আমার প্রতিপালকের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছি এবং তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছি কিন্তু তোমরা কল্যাণকামীদের ভালবাস না’ (আ‘রাফ ৭/৭৩-৭৯)। ছালেহ (আঃ)-এর উপরোক্ত দাওয়াত ও তাঁর কওমের আচরণ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২২টি সূরায় ৮৭টি আয়াতে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইবনু কাছীর বর্ণনা করেন যে,হযরত ছালেহ (আঃ)-এর নিরন্তর দাওয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা স্থির করল যে, তাঁর কাছে এমন একটা বিষয় দাবী করতে হবে,যা পূরণ করতে তিনি ব্যর্থ হবেন এবং এর ফলে তাঁর দাওয়াতও বন্ধ হয়ে যাবে। সেমতে তারা এসে তাঁর নিকটে দাবী করল যে, আপনি যদি আল্লাহর সত্যিকারের নবী হন, তাহলে আমাদেরকে নিকটবর্তী ‘কাতেবা’ পাহাড়ের ভিতর থেকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী সবল ও স্বাস্থ্যবতী উষ্ট্রী বের করে এনে দেখান। এ দাবী শুনে হযরত ছালেহ (আঃ) তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলেন যে, যদি তোমাদের দাবী পুরণ করা হয়, তবে তোমরা আমার নবুঅতের প্রতি ও আমার দাওয়াতের প্রতি ঈমান আনবে কিনা। জেনে রেখ, উক্ত মু‘জেযা প্রদর্শনের পরেও যদি তোমরা ঈমান না আনো, তাহলে আল্লাহর গযবে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে’। এতে সবাই স্বীকৃত হলো ও উক্ত মর্মে অঙ্গীকার করল। তখন ছালেহ (আঃ) ছালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ পাক তার দো‘আ কবুল করলেন এবং বললেন,‘আমরা তাদের পরীক্ষার জন্য একটি উষ্ট্রী প্রেরণ করব। তুমি তাদের প্রতি লক্ষ্য রাখ এবং ধৈর্য ধারণ কর’ (ক্বামার ৫৪/২৭)। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ের গায়ে কম্পন দেখা দিল এবং একটি বিরাট প্রস্তর খন্ড বিস্ফোরিত হয়ে তার ভিতর থেকে কওমের নেতাদের দাবীর অনুরূপ একটি গর্ভবতী ও লাবণ্যবতী তরতাযা উষ্ট্রী বেরিয়ে এলো।

ছালেহ (আঃ)-এর এই বিস্ময়কর মু‘জেযা দেখে গোত্রের নেতাসহ তার সমর্থক লোকেরা সাথে সাথে মুসলমান হয়ে গেল। অবশিষ্টরাও হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করল কিন্তু প্রধান ধর্মনেতা ও অন্যান্য সমাজ নেতাদের বাধার কারণে হতে পারল না। তারা উল্টা বলল, ‘আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা আছে তাদেরকে অকল্যাণের প্রতীক মনে করি’ (নামল ২৭/৪৭)। হযরত ছালেহ (আঃ) কওমের নেতাদের এভাবে অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে দেখে এবং পাল্টা তাঁকেই দায়ী করতে দেখে দারুণভাবে শংকিত হলেন যে, যেকোন সময়ে এরা আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি তাদেরকে সাবধান করে বললেন,‘দেখ, তোমাদের মঙ্গলামঙ্গল আল্লাহর নিকটে রয়েছে। বরং তোমরা এমন সম্প্রদায়, যাদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে’ (নামল ২৭/৪৭)।অতঃপর পয়গম্বরসূলভ দয়া প্রকাশ করে বললেন,‘এটি আল্লাহর উষ্ট্রী। তোমাদের জন্য নিদর্শন স্বরূপ। একে আল্লাহর যমীনে স্বাধীনভাবে চরে বেড়াতে দাও। সাবধান! একে অসৎ উদ্দেশ্যে স্পর্শ করো না। তাহ’লে তোমাদেরকে সত্বর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি পাকড়াও করবে’ (হূদ ১১/৬৪)।
কওমে সামূদ এর ধ্বংস কাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ : ১.সমাজের মুষ্টিমেয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও শক্তিশালী শ্রেণী সবার আগে শয়তানের পাতানো ফাঁদে পা দেয় ও সমাজকে জাহান্নামের পথে আহবান করে এবং তাদেরকে ধ্বংসের পথে পরিচালনা করে। যেমন কওমে
সামূদ-এর প্রধান নয় কুচক্রী নেতা করেছিল (নামল ২৭/৪৮)। ২. দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা সাধারণতঃ অন্যদের আগে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী হয় ও এজন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হয়ে যায়। ৩. অবিশ্বাসীরা মূলতঃ দুনিয়াবী স্বার্থে আল্লাহ প্রেরিত শরী‘আতে বিশ্বাস ও তদনুযায়ী আমল প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজেদের কল্পিত শিরকী আক্বীদায় বিশ্বাস ও তদনুযায়ী আমলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং তারা সর্বদা তাদের বাপ-দাদা ও প্রচলিত প্রথার দোহাই দেয়।৪. নবী ও সংস্কারকগণ সাধারণতঃ উপদেশদাতা হয়ে থাকেন- শাসক নন। ৫. নবী ও সংস্কারকদের বিরুদ্ধে শাসক ও সমাজ নেতাগণ যুলুম করলে সরাসরি আল্লাহর গযব নেমে আসা অবশ্যম্ভাবী। ৬. মানুষকে বিপথে নেওয়ার জন্য শয়তানের সবচাইতে বড় হাতিয়ার হলো নারী ও অর্থ-সম্পদ।৭. হঠকারী ও পদগর্বী নেতারা সাধারণতঃ চাটুকার ও চক্রান্তকারী হয়ে থাকে ও ঈমানদারগণের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে জয়ী হয় কিন্তু অবশেষে আল্লাহর কৌশল বিজয়ী হয় এবং কখনো কখনো তারা দুনিয়াতেই আল্লাহর গযবে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। আর আখেরাতের আযাব হয় তার চাইতে কঠিনতর (ক্বলম ৬৮/৩৩)।৮. অল্লাহ পাক তাঁর বান্দাকে নে‘মতরাজি দান করেন তাকে পরীক্ষা করার জন্য। শুকরিয়া আদায় করলে সে আরও বেশি পায় কিন্তু কুফরী করলে সে ধ্বংস হয় এবং উক্ত নেয়ামত তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ৯. অহংকারীদের অন্তর শক্ত হয়। তারা এলাহী গযব প্রত্যক্ষ করার পরেও তাকে তাচ্ছিল্য করে। যেমন নয় নেতা ১ম দিন গযবে ধ্বংস হ’লেও অন্যেরা তওবা না করে তাচ্ছিল্য করেছিলো। ফলে অবশেষে ৪র্থ দিন তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। ১০. আল্লাহ যালেম জনপদকে ধ্বংস করেন অন্যদের শিক্ষা গ্রহণের জন্য। ১১. আল্লাহ সংশোধনকামী জনপদকে কখনোই ধ্বংস করেন না। ১২. কখনো মাত্র একজন বা দু’জনের কারণে গোটা সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। ছালেহ (আঃ)-এর উষ্ট্রী হত্যাকারী ছিলো মাত্র দু’জন। অতএব মুষ্টিমেয় কুচক্রীদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সমাজকে সদা সতর্ক থাকতে হয়। ১৩. কুচক্রীদের কৌশল আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন কিন্তু তারা বুঝতে পারে না। যেমন ছামূদ কওমের নেতারা বুঝতে না পেরে অযথা দম্ভ করেছিলো (নামল ২৭/৫০-৫১)।১৪. আল্লাহ মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্যই দুনিয়াতে ছোট-খাট শাস্তির আস্বাদন করিয়ে থাকেন ও তাদেরকে ভয় দেখান (ইসরা ১৭/৫৯; সাজদাহ ৩২/২১)। ১৫. সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্বে অবশেষে সত্য সেবীদেরই জয় হয়। যেমন হযরত ছালেহ (আঃ) ও তাঁর ঈমানদার দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা এলাহী গযব থেকে নাজাত পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন ও মিথ্যার পূজারী শক্তিশালীরা ধ্বংস হয়েছিলো।
আদ জাতির ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পরে হযরত সালেহ (আঃ) কওমে সামূদ-এর প্রতি নবী হিসাবে প্রেরিত হন। সামূদ আরবের প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় জাতি। আদ জাতির পরে এরাই সবচেয়ে বেশী খ্যাতি ও পরিচিতি অর্জন করে। কওমে ‘আদ ও কওমে সামূদ একই দাদা ‘ইরাম’ এর দুটি বংশধারার নাম। তাদের প্রধান শহরের নাম ছিলো ‘হিজর’ যা শামদেশ অর্থাৎ সিরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। বর্তমানে একে সাধারণভাবে ‘মাদায়েনে সালেহ’ বলা হয়ে থাকে। উত্তর-পশ্চিম আরবের যে এলাকাটি আজো ‘আল হিজর’ নামে খ্যাত, সেখানেই ছিলো এদের আবাস। আজকের সাউদী আরবের অন্তর্গত মদীনা ও তাবুকের মাঝখানে মদীনা থেকে প্রায় ২৫০/৩৫০ কিঃ মিঃ দূরে একটি স্টেশন রয়েছে, তার নাম মাদায়েনে সালেহ। এটিই ছিলো সামূদ জাতির কেন্দ্রীয় স্থান।

হযরত ছালেহ (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বৃহস্পতিবার ভোরে অবিশ্বাসী কওমের সকলের মুখমন্ডল গভীর হলুদ বর্ণ ধারণ করল। কিন্তু তারা ঈমান আনল না বা তওবা করল না। বরং উল্টা হযরত ছালেহ (আঃ)-এর উপর চটে গেল ও তাঁকে হত্যা করার জন্য খুঁজতে লাগল। দ্বিতীয় দিন সবার মুখমন্ডল লাল বর্ণ ও তৃতীয় দিন ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে গেল। তখন সবাই নিরাশ হয়ে গযবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। চতুর্থ দিন রবিবার সকালে তারা সুগন্ধি মেখে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকল কি শাস্তি ও আযাব নাযিল হয় তা দেখার জন্যে। তাদের কোনই ধারণা ছিল না যে, তাদেরকে কি করা হবে এবং কোন দিক থেকে আযাব আসবে। কিছু সময় পর সূর্য যখন উপরে এসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল,তখন আসমানের দিক থেকে বিকট আওয়াজ এলো এবং নিচের দিক থেকে প্রবল ভূকম্পন শুরু হল। সাথে সাথে তাদের প্রাণবায়ু উড়ে গেল,সকল নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল,সবকিছু স্তব্ধ হলো এবং যা সত্য তাই বাস্তবে ঘটে গেল। ফলে সবাই লাশ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। অন্য আয়াতে এসেছে যে,আমরা তাদের প্রতি একটিমাত্র নিনাদ পাঠিয়েছিলাম। তাতেই তারা শুষ্ক খড়কুটোর মত হয়ে গেলো। কোনো কোনো হাদীছে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,সামুদ জাতির উপরে আপতিত গযব থেকে ’আবু রেগাল’ নামক জনৈক অবিশ্বাসী নেতা ঐ সময় মক্কায় থাকার কারণে বেঁচে গিয়েছিলো কিন্তু হারাম শরীফ থেকে বেরােবার সাথে সাথে সেও গযবে পতিত হয়। এভাবেই আল্লাহর নাফরমান ও নবীকে নিয়ে চক্রান্তকারী এক জাতির সমাপ্তি ঘটেছিলো।

সামুদ জাতি শিল্প ও সংস্কৃতিতে পৃথিবীতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আদ জাতির পর তারাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধিশালী জাতি কিন্তু তাদের জীবনযাপনের মান যতটা উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল,মানবতা ও নৈতিকতার মান ততই নিম্নগামী ছিলো। একদিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে পাথর খোদাই করে করে প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে সমাজে কুফর, শিরক ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটছিলো। অন্যায় ও অবিচারে সমাজ জর্জরিত হতে থাকে। সমাজে চরিত্রহীন লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। হজরত সালেহ (আ.) যে সত্যের দাওয়াত দিয়েছেন,তাতে নিম্ন শ্রেণির লোকেরাই সাড়া দেয়। হিজর ছিলো সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসস্থল।এর ধ্বংসাবশেষ মদিনার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। বর্তমান শহর আল উলা থেকে কয়েক মাইল ব্যবধানে তা দেখা যায়। সালেহ (আ.) সারা জীবন তাদের হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করেছেন। এতে অল্প কিছু সঙ্গী ছাড়া গোটা জাতি তার অবাধ্যই থেকে যায়।

আবার কোনো কোনো ইতিহাসবেত্তাগণ লিখেছেন, সামূদ সম্প্রদায়ের এ আযাব থেকে একজন মাত্র মহিলা ছাড়া আর কেউই মুক্তি পায়নি। মহিলাটির নাম কালবা বিনতে সালাকা,ডাকনাম যারীয়া। সে ছিলো কট্টর কাফির ও হযরত সালিহ (আঃ)-এর চরম বিদ্বেষি। আযাব আসতে দেখেই সে দ্রুত বের হয়ে দৌড়ে এক আরব গোত্রে গিয়ে উঠল এবং তার সম্প্রদায়ের উপর পতিত যে আযাব সে প্রত্যক্ষ করে এসেছে-তার বর্ণনা দিল। পিপাসায় কাতর হয়ে সে পানি পান করতে চাইল কিন্তু পানি পান করার সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
সৌদি আরবের বর্তমান আল-উলা প্রদেশের মাদায়েনে সালেহ বা আল-হিজর সৌদি পর্যটন আর্কষণসমূহের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের অধিকারী। ২০০৮ সালে ইউনেস্কো মাদায়েনে সালেহকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে। প্রাচীন লিহওয়ানদের রাজধানী এই শহরটিই সউদি আরবের প্রথম বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্থান। লিহওয়ানদের পূর্বে এই স্থানে সামুদ জাতির বসবাস ছিলো। তাদের হেদায়তের জন্য আল্লাহ হযরত সালেহ (আ.)কে প্রেরণ করেছিলেন। মাদায়েনে সালেহ স্থানটির নাম নবী হযরত সালেহ (আ.) এর নাম হতে এসেছে। পরবর্তীতে তার কথা না মানায় তার জাতি আল্লাহর আজাবে ধ্বংস হলে তিনি এই স্থ্না থেকে হিযরত করে চলে যান। এরপর থেকে এটি একটি মৃত নগরীতে পরিণত হয়। এই স্থানটি এখনো একটি বড় ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন বহন করে চলছে। বর্তমানে মাদায়েনে সালেহের এই স্থানটি সউদি আরবের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যসমূহের মধ্যে একটি। এখানকার আকর্ষণীয় স্থানসমূহের মধ্যে একটি হল হাতির পাহাড়। হাতির আকৃতির এই পাহাড়টি ৫০ মিটার উঁচু। এর ব্যতিক্রমী আকৃতির কারণে এটি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান। মাদায়েনে সালেহের সমগ্র অঞ্চলটি কমলা,লেবু ও পামগাছে পরিপূর্ণ,যা এই মৃতস্থানটির মাঝে প্রাণের সঞ্চার করেছে। মরুভ্রমণ এবং ঘোড়দৌড়ের জন্য এই স্থানটি একটি আদর্শ স্থান।

সিরিয়া হতে মদীনা পর্যন্ত ওসমানী আমলে নির্মিত রেললাইনের ধারে এ স্থানে ওসমানী যুগের একটি সেনাঘাটি রয়েছে। এই সেনাঘাটির সন্নিবেশিত রেলস্টেশনটি হিজাজের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলস্টেশন। রেলের মেরামত কারখানা, সৈন্যদের থাকার জন্য দুর্গ, মসজিদ, অস্ত্রাগার প্রভৃতির সমন্বয়ে পুরো ঘাটিটি নির্মিত। হযরত সালেহ (আ.) এর উটের পানি পানের কূপটিও এখানে অবস্থিত। সামুদ ও নাবাতিয়ানদের প্রাচীন অনেক নির্দশন এই স্থানে রয়েছে,যা এই প্রাচীন জাতিগুলোর স্থাপত্যকৌশলের প্রমাণ আজো বহন করে চলছে। পাহাড় খোদাই করে সামুদ ও নাবাতিয়ানদের নির্মিত বিভিন্ন প্রাসাদ ও স্থাপনাগুলো দর্শকদের বিস্মিত করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে পর্যটকরা মাদায়েনে সালেহ ভ্রমণ করতে আসে। সৌদি আরব এবং সৌদি আরবের বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকদের আগমনে মৃত এই নগরী সদা প্রাণবন্ত থাকে।
হযরত সালেহ (আঃ) সামুদ জাতির জন্য পয়গম্বর নিয়োজিত হয়েছিলেন। তাঁর জাতি মদীনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে বসবাস করতো। হুদ (আঃ) এর উম্মত আ’দ জাতি যখন আল্লাহ তা’য়ালার গজবে পড়ে সম্পূরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল,তখন হুদ (আঃ) এবং তাঁর অনুসারী মোমেনগন আল্লাহর অশেষ রহমতে রক্ষা পেয়েছিলেন। তারাই পরবর্তীকালে সামুদ জাতি হিসেবে পরিচিত হয়েছেন। সামুদ জাতি পার্থিব সভ্যতায় বেশ উন্নত ও প্রগতিশীল ছিলো। তারা ‘ওয়াদিল কুরা’ নামক এলাকায় পাহাড়-পর্বতের ভিতরে, উপরে ও সমতলভূমিতে সুরম্য প্রসাদ নির্মান করতো। পাহাড় কেটে এই সমস্ত বাড়ি বা স্থাপনাগুলো তৈরি করা হয়েছিলো। এগুলোকে ‘শাহী হাবিলী’ বা রাজকীয় প্রাসাদ নামে অভিহিত করছে। সিরিয়া থেকে হেজাজে যাবার সময় এই সমস্ত স্থাপনাগুলো দেখা যায়। কালের বিবর্তনে যখন সামুদ জাতি এক আল্লাহর এবাদত বন্দেগী ত্যাগ করে পৌত্তলিকতায় এবং মূর্তি পূজায় লিপ্ত হলো, তখন সালেহ (আঃ) তাদের মাঝেই জন্ম গ্রহন করলেন এবং তাদের জন্য নবীরূপে মনোনীত হলেন।

আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির হেদায়েত এবং পথপ্রদর্শনের লক্ষ্যে সর্বযুগে প্রত্যেক জাতির কাছে নবী-রাসুল আলাইহিমুস সালামদের প্রেরণ করেছেন।সম্মানিত নবী-রাসুলগণ প্রত্যেকেই ছিলেন কর্মঠ,সৎকর্মশীল এবং নিজ হাতে উপার্জনকারী। গোটা মানবজাতির জন্য তারা ছিলেন পথপ্রদর্শক এবং আদর্শ। তারা ছিলেন জগতের একেকজনন শ্রেষ্ঠ মানব। তাদের জীবনাচার কেমন ছিলো,তাদের আদর্শ, অভ্যাস, পেশা ও কাজকর্ম সম্মন্ধে অবগতিলাভ করার ভেতরে মানবজাতির জন্য নিঃসন্দেহে শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। নবী-রাসুলগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে কুরআনুল হাকিমে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইরশাদ করেন,‘প্রতিটি জাতির জন্য পথ-প্রদর্শনকারী রয়েছে।’(সুরা আর রাদ,আয়াত,৭) অন্যত্র ইরশাদ করেছেন,‘আমি রাসুল প্রেরণ না করে কাউকে শাস্তি দিই না।’(সূরা বনি ইসরাইল,আয়াত,১৫) সব নবী-রাসুলগণ ছিলেন মানবজাতির প্রতি প্রেরিত শিক্ষকতুল্য এবং আদর্শ।সালেহ (আ:) কুরআনের বর্ণনা অনুসারে একজন নবী। যাকে ‘সামূদ জাতির’ উদ্দেশ্যে আল্লাহ প্রেরণ করা হয়েছিলো। তারা নূহ এর পুত্র সামের বংশধর এবং প্রাচীন আরব জাতিসমূহের একটি। ইসলামের অনুসারীরাও বিশ্বাস করেন তাদের কয়েকজন নবী-রাসুলের আল্লাহর অনুগ্রহে অলৌকিক ক্ষমতা ছিলো,যাকে বলা হয় ‘মোজেজা’। তেমনি সালেহ (আ.)কে দেওয়া হয়েছিলো মোজেজা। সালালা শহরের মাঝেই রয়েছে সালেহ নবীর মোজেজার নিদর্শন।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,শিক্ষক,গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট