সুন্দরবনে শিকারি চক্রের ফাঁদে অসহায় জীববৈচিত্র্য

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলির অন্যতম। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখন্ড বনভূমি।

বাংলায় সুন্দরবন-এর আক্ষরিক অর্থ সুন্দর জঙ্গল বা সুন্দর বনভূমি। সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়তো হয়েছে “সমুদ্র বন” বা “চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)” (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে সুন্দরী গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে। ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে। ঐতিহাসিক আইনি পরিবর্তনগুলোয় কাক্সিক্ষত যেসব মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বাবধানের অধীনে আসা। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর এর কাছ থেকে স্বত্বাধিকার পাওয়ার পরপরই সুন্দরবন এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়। বনাঞ্চলটি সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভারতের তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের পর থেকে।

বাংলাদেশের অংশ ৬,০১৭ বর্গ কি.মি.আয়তনের সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ, দীর্ঘতম লবণাক্ত জলাভূমি এবং জীব বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম। এখানে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিদ্যমান, যার মধ্যে আছে ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩১৫ প্রজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং বিশ্ব বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। প্রধান সরীসৃপ জাতিগুলোর মধ্যে আছে নোনা পানির কুমির, অজগর, গোখরা, গুইসাপ, সামুদ্রিক সাপ, গিরগিটি, কচ্ছপ এবং অন্যান্য। সুন্দরবনকে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা। মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। প্রায় ৩০ প্রজাতির সাপ সুন্দরবনে পাওয়া যায়। জলাভূমি হিসাবে রামসার এলাকার সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় সুন্দরবনকে ১৯৯২ সালে ৫৬০ তম রামসার এলাকা হিসাবে যোষণা করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিলো। বনের ওপর মানুষের অধিক চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে। ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্ত্বাধীকার অর্জন করে। এল. টি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনের প্রথম জরীপ কার্য পরিচালনা করেন। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে। যা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় ৪.২% এবং সমগ্র বনভূমির প্রায় ৪৪%।
হাজার বছর ধরে বঙ্গোপসাগর বরাবর আন্তঃস্রোতীয় প্রবাহের দরুণ প্রাকৃতিকভাবে উপরিস্রোত থেকে পৃথক হওয়া পলি সঞ্চিত হয়ে গড়ে উঠেছে সুন্দরবন। এর ভৌগোলিক গঠন ব-দ্বীপীয়, যার উপরিতলে রয়েছে অসংখ্য জলধারা এবং জলতলে ছড়িয়ে আছে মাটির দেয়াল ও কাদা চর। এতে আরো রয়েছে সমুদ্র সমতলের গড় উচ্চতার চেয়ে উঁচুতে থাকা প্রান্তীয় তৃণভূমি, বালুতট এবং দ্বীপ, যেগুলো জুড়ে জালের মত জড়িয়ে আছে খাল, জলতলের মাটির দেয়াল,আদি ব-দ্বীপীয় কাদা ও সঞ্চিত পলি। সমুদ্রসমতল থেকে সুন্দরবনের উচ্চতা স্থানভেদে ০.৯ মিটার থেকে ২.১১ মিটার। জৈবিক উপাদানগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সামুদ্রিক বিষয়ের গঠন প্রক্রিয়া ও প্রাণী বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে। সৈকত, মোহনা, স্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী জলাভূমি, কাদা চর, খাঁড়ি, বালিয়াড়ি, মাটির স্তুপের মতো বৈচিত্র্যময় অংশ গঠিত হয়েছে। উপকূল বরাবর সুন্দরবনের গঠন প্রকৃতি বহুমাত্রিক উপাদানসমূহ দ্বারা প্রভাবিত, যাদের মধ্যে রয়েছে স্রোতের গতি, ব্যষ্টিক ও সমষ্টিক স্রোত চক্র এবং সমুদ্র উপকূলবর্তী দীর্ঘ সমুদ্রতটের স্রোত। বিভিন্ন মৌসুমে সমুদ্রতটের স্রোত যথেষ্ট পরিবর্তনশীল।

প্রসিদ্ধ চৈনিক পর্যটক-পরিব্রাজক ও বৌদ্ধ ধর্মযাজক হিউয়েন সাং ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ সাল পর্যন্ত ধর্মপ্রচার এবং পরিব্রজনের জন্য অবস্থান করেন পুরোনো ভারতবর্ষে। সে সময় সুন্দরবনকে তিনি উল্লেখ করেছেন ‘সাগরসীমানায় অবস্থিত ফসলি নিম্নভূমি’ হিসেবে। সম্ভবত তিনি ৬৪০ সালের দিকে বর্তমান বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করেন। এর কাছাকাছি কোনো এক সময় তিনি সম্ভবত সুন্দরবন দর্শন করেছেন। অর্থাৎ ভারতবর্ষে আগমনকারী পরিব্রাজক ও শাসক, যাঁদের কাছে সুন্দরবনের মতো একটি বিশেষ বনের সংবাদ পৌঁছেছে। এবং তাঁরা এ বনের খবর নিয়েছেন বা এটি দর্শনের চেষ্টা করেছেন। মোগল আমল থেকে এ অঞ্চলের মানুষের দৃষ্টি পড়ে সুন্দরবনের ওপর। জীবনধারণের জন্য অনেকে বাধ্য হন দেশের এ দুর্গম এলাকার আশপাশে বসতি করার জন্য। জীবনযুদ্ধে তাঁরা জয়ী হয়েছেন এবং বারবার পরাভূত হয়েছে সুন্দরবনের পরাক্রম।

যুগ যুগ ধরে সুন্দরবন লাখো মানুষের জীবনজীবিকার উৎসস্থলই রয়ে যায়নি, সে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা চাঙা রেখেছে। হাজার মানুষকে রক্ষা করেছে গোর্কি, সিডর, আইলার মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছোবল থেকে। কেবল উপমহাদেশেরই বা বলি কেনো,বিশ্বের কোথাও আমাদের সুন্দরবনের মাপের ও প্রকৃতির কোনো বন নেই। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বন, ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া ও মধ্য আফ্রিকার চিরহরিৎ ও মিশ্র চিরসবুজ বনের সক্ষমতা রাখে সুন্দরবন। আর এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সব গ্রীষ্মমন্ডলীয় বন এবং আচ্ছাদিত বন বা গ্যালারি ফরেস্ট থেকে বেশ ভিন্নতর। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, সুন্দরবন সমুদ্রমুখ বনের পর্যায়ে পড়ে। মূলত নদীর মোহনায় মিঠাপানির স্রোত যখন সাগরের লোনাপানিতে মেলে, তখন সেখানে পানির গতিবেগের হেরফের ও তা ঘূর্ণনের ফলে নদীবাহিত হয়ে আসা পলি ও বালু জমে গড়ে ওঠে মাটি। এ ভূমি দারুণ উর্বরা। ফলে এতে বেড়ে ওঠে সুন্দরবনের মতো সব বাদাবন। বিশ্বের বহু উপকূলীয় এলাকায় এমন বন দেখা গেলেও সেখানে সুন্দরবনের মতো এমন উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমাহার নেই। এখানে আছে সুন্দরীগাছসহ ৩০০-৩৫০ প্রজাতির গাছ, বাঘ, হরিণ, বানর, শূকর, তিন প্রজাতির গন্ডার, বুনো মোষ, বারশিঙ্গা বা জলাভূমির হরিণ, মায়া হরিণ, বনবিড়াল ও গন্ধগোকুল, শিয়াল-বেজির দল, লোনাপানির কুমির, কুমিরসদৃশ কালা গদি বা রিং লিজার্ড বা মনিটর, বিষধর রাজগোখরা বা কিং কোবরাসহ আরও অসংখ্য প্রজাতির গোখরা, শাকিনী,বাঁশবোরসহ বহু প্রজাতির সাপ ও সরীসৃপ, প্রায় তিন শ পাখির প্রজাতি, অনেক ব্যাঙ, মাছ ও চিংড়ি-কাঁকড়াসহ বহু জানা-অজানা অমেরুদন্ডী প্রাণী।

সুন্দরবনে প্রাণীবৈচিত্র্য সংরক্ষণব্যবস্থাপনা কিছু কিছু এলাকায় শিকার নিষিদ্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ অভয়ারণ্যের মত, যেখানে শর্তহীনভাবে বনজ সম্পদ সংগ্রহ করা যায়না এবং বন্য প্রাণীর জীবনে সামান্যই ব্যাঘাত ঘটে। যদিও এটা স্পষ্ট যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রাণী সম্পদ হ্রাস পেয়েছে এবং সুন্দরবনও এর বাইরে নয়। তারপরও সুন্দরবন বেশ অনেকগুলি প্রাণীপ্রাজাতি ও তাদের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রজাতিদের টিকিয়ে রেখেছে। এদেরমধ্যে বাঘ ও শুশুককে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে প্রানীবৈচিত্র্যসংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ও পর্যটন উন্নয়নের। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সম্পূর্ণবিপরীত পরিবেশে থাকা এ দুইটির অবস্থা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা সামগ্রিক প্রাণীবৈচিত্র্য এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার শক্তিশালী সূচক। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসেব মতে সুন্দরবন ৫০০ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল যা পৃথিবীতে বাঘের একক বৃহত্তম অংশ।

পর্যটক ছাড়াও বাওয়ালি, মৌয়াল এবং জেলেদের বছরের যে কোনো সময় সুন্দরবনে যাতায়াত করতে হয়। তারা জীবিকার তাগিদে জীবন বাজি রেখে বনে প্রবেশ করেন। বনের হিংস্র বাঘকে তারা ফাঁকি দিতে সক্ষম হলেও বনদস্যুদের হিংস্রতা এবং বুদ্ধিমত্তার কাছে হার মানেন। কারণ এতদঞ্চলে রয়েছে ১৪টি দলভুক্ত বনদস্যুর সমাগম। সংখ্যায় প্রতিটি দলে গড়ে ৩০-৩৫ জন বনদস্যূ থাকে। তাদের প্রতিটি দলের সব সদস্যই থাকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। দস্যুদের ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো আসে দেশের বাইরে থেকে। পাকিস্তান, মিয়ানমার, ভারত, ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে এ অস্ত্র তারা সংগ্রহ করে। আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক ওয়াকিটকি, স্পিডবোটসহ নানা ধরনের আধুনিক জিনিসপত্র। সুন্দরবনকে ‘দস্যূমুক্ত’ ঘোষণার পরও খুব বেশি স্বস্তিতে নেই বননির্ভরশীল জেলে-বাওয়ালি-মৌয়ালরা। নয়া দস্যূবাহিনীর আবির্ভাবে জেলেদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আগের মতোই সুন্দরবনে শুরু হয়েছে জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়।পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের গহীনে দাড়গাং খালে মাছ ধরার সময় মুক্তিপণের দাবিতে এক জেলেকে অপহরণ করেছে বনদস্যূ খান বাহিনীর সদস্যরা।

আবহাওয়া পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের রক্ষাকবজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে গাছপালা ও প্রাণিকূল হুমকির মুখে। বিরূপ আবহাওয়া ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে বনের অনেক প্রাণি বিলুপ্ত হতে চলেছে। অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে গত কয়েক দশকের ব্যবধানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক প্রাণি। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কম লবণসহিষ্ণু গাছ ও বণ্যপ্রাণীর ওপর। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০টি প্রজাতির বন্যপ্রাণির অস্তিত্ব হুমকির মুখোমুখি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। বিপন্ন প্রাণিসমূহের মাঝে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতাবাঘ, হাতি, অজগর সাপ, কুমির, ঘড়িয়াল ইত্যাদি। এ ছাড়া সুন্দর বনের সুন্দরী গাছও এখন হুমকির মুখে। এ ছাড়া সুন্দরবন থেকে এরইমধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষের আগ্রাসনে চিরতরে হারিয়ে গেছে এক প্রজাতির বন্য মহিষ, দুই প্রজাতির হরিণ, দুই প্রজাতির গন্ডার ও এক প্রজাতির মিঠাপানির কুমির। এছাড়াও সর্বজনীন এ আবাসভূমি ক্রমেই ধ্বংস করে চলেছে মানবসমাজ। বনভূমি কেটে উজার করা, কৃষি জমিতে ইমারত স্থাপন,পরিবেশের কথা বিবেচনা না করে ঝুকিপূর্ণ কলকারখানা নির্মাণ, খাল, বিল জলাশয়ের যায়গা ভরাট করে তো একদিকে আমরা নিজেরা পরিবেশের ক্ষতি করছি, আবার অন্যদিকে অনাগত ভবিষ্যত প্রজন্মকে করছি অনিরাপদ। যার দরুণ পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে,মেরু অঞ্চলের বরফ গলা বেড়েছে, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার পাশাপাশি দেশগুলোও হুমকির মুখে অগ্রসর হচ্ছে।

সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামে অনেক আগে থেকেই চোরা শিকারি ও পাচারকারী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ আবার বংশ পরম্পরা সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শিকার করে চলেছেন। এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য বাঘ ও চিত্রা হরিণ। শিকারি চক্র চোরাপথে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বাঘ-হরিণ হত্যা করছে। তারা বনের মধ্যে হরিণ জবাই করে মাংস বানিয়ে লোকালয়ে এনে কেজি দরে বিক্রি করে। আর বাঘ ও হরিণের চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি চলে।

বিশ্ব ঐতিহ্য একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রল হরিণ ও সুন্দরী বৃক্ষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে সম্প্রতি সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। হ্রাসও পেয়েছিলো সুন্দরী গাছ পাচার। কিন্তু চলমান করোনাভাইরাসের প্রার্দুভাবে নদ-নদী ও রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ও চোরা শিকারিরা সুন্দরবনে মেতে উঠেছে হরিণ শিকার এবং গাছ পাচারে। শুধু বন্যপ্রাণীই নয়,বনের সুন্দরি,পশুর গাছ নিধনসহ বিষ দিয়ে মাছ শিকারের মহোৎসব চলছে বনের ভেতরের নদী-খালে। সংঘবদ্ধ বৃক্ষচোর, বিষ প্রয়োগকারী দুর্বৃত্ত ও চোরা শিকারিদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরবনে রেড এলার্ট জারি করে টহল জোরদার করা হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে বাঁচাতে ১৫৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের খুলনা, সাতক্ষীরা,বাগেরহাট,পিরোজপুর ও বরগুনা জেলার মোট ৩৯টি উপজেলা ঘিরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলেই আশা বাংলাদেশ সরকারের।

সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে চোরা হরিণ শিকারীদের তৎপরতা। সুন্দরবনের বাঘের চামড়া ও হরিণের মাংসসহ চামড়া পাচার এখন নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৪২ কেজি হরিণের মাংসসহ চোরা শিকারী বাবা-ছেলে,শরখোলা উপজেলার রায়েন্দা বাজার বাসস্টান্ড সংলগ্ন এলাকা থেকে ১৯টি হরিণের চামড়াসহ শরণখোলা উপজেলার দুই বাসিন্দা, সুন্দরবনের পাহারাদার হিসাবে খ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের চামরাসহ এক জেলে, ৪৭ কেজি হরিণের মাংস দুই চোরা শিকারী ও ২২ কেজি মাংসসহ এক চোরা শিকারী পাচারকারী গ্রেফতারের ঘটনায় উঠে এসেছে সুন্দরবনের উদ্বেগজনক চিত্র।

জানা যায় বাগেরহাট পূর্ব সুন্দরবন ৩০ মার্চ ২০২০ থেকে ফেব্রুয়ারীর ৩ তারিখ ২০২১ পর্যন্ত বনবিভাগ, পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ডের অভিযানে ২৩৪ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করা হয়। এর সাথে দুই হাজার ৫২৫ফুট হরিণ শিকারের ফাঁদ ও ৯টি নৌকা জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। হরিণ শিকার ও বাঘ ও হরিণের চামড়া পাচারের অপরাধে গ্রেফতার হয় ৩১ চোরা শিকারি। এসব ঘটনায় করা ২৩টি মামলায় আসামি পলাতক রয়েছে ৫৫ জন। বিভিন্ন সময় গ্রেফতার এ জেলে বনজীবী ও চোরা শিকারীদের কাছ থেকে ১১ মাসে ২৪টি জীবিত হরিণ, ১০টি হরিণের মাথা, ৩০টি পা জব্দ করা হয়। ২০১৯ সালের ২২ মে সর্বশেষ বাঘ জরিপে সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘ রয়েছে মাত্র ১১৪ টি। এর মধ্যে ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন বিভাগের হিসেবে ৫৫টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে মারা গেছে মাত্র ১৫টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়া ১৪টি বাঘকে পিটিয়ে মেরেছে স্থানীয় জনতা, একটি নিহত হয়েছে ২০০৭ সালের সুপার সাইক্লোন সিডরে ও বাকী ২৭টি বাঘ বিভিন্ন সময় হত্যা করেছে চোরা শিকারীরা।

সুন্দরবনে হরিণ শিকার হঠাৎ করেই উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১২ শিকারিকে হরিণের মাংস ও চামড়াসহ আটক করা হয়েছে। শিকারিদের ধরতে সুন্দরবনে স্মার্ট প্যাট্রল এবং বন বিভাগের টহল থাকলেও অদৃশ্য কারণে শিকার কমছে না। কখনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর চোখ ফাঁকি দিয়ে চুরি করে বনে ঢুকে শিকারিরা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করছে। বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়ে শিকারিদের সুযোগ করে দিচ্ছেন কিছু অসাধু ব্যক্তিবর্গরা। তারা শিকারি চক্রের কাছ থেকে হরিণের মাংসসহ আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করায় দিন দিন সুন্দরবনে হরিণ শিকার বাড়ছে।

পৃথিবীর সবচেয়ে অরক্ষিত ভূখন্ডের নাম সুন্দরবন। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিস্তৃত এই দ্বীপ অঞ্চল। সুন্দরবনের ওপর আশপাশের এলাকার লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। তবে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয়রা ইদানিং মাছ, মধু, মোম,ঔষধি গাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া বেশিমাত্রায় আহরণ করায় বনভূমির ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়েছে। এ কারণেই তাদের দিকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী জরিপ এবং জলজ সম্পদের পরিমাণ নিরূপণে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনে মাটি ও জলের লবণাক্ততা পরীক্ষা ও জরিপ করা হবে। এ জন্য ‘সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সরকার মনে করছে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সুন্দরবনে জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

সুন্দরবন আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। পৃথিবীর যেকোনো সভ্য জাতিই তাদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে। আর আমাদের সুন্দরবন তো শুধু আমাদের নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যেরই অংশ। তাই একে নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই সুন্দরবন যে প্রতিদিন তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে, সেদিকে কারো দৃষ্টি নেই। সুন্দরবনে প্রতিনিয়ত মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়ছে, দূষণ বাড়ছে,অবৈধ অত্যাচার বাড়ছে। ফলে সুন্দরবন ক্রমেই ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। সেখানে বন্য প্রাণীদের আবাসযোগ্যতাও ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা সুন্দরবনে ভালো নেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার, মায়াবি চিত্রল হরিণ। এই দুই বন্যপ্রাণী এখন চোরা শিকারি ও পাচারকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। সুন্দরবনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন শিকারি চক্রের সদস্যরা। একের পর এক নিধন করা হচ্ছে বন্যপ্রাণী। ফাঁদ পেতে, বিষটোপ দিয়ে এবং গুলি করে বাঘ ও হরিণ হত্যা করা হচ্ছে। এসব বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার রোধে তাৎক্ষণিক শাস্তিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রীণ ক্লাব, মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট