সৃজনীশক্তি ও আলোড়িত শক্তিমান কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তাঁর প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মুহূর্তে বাংলা কথা-সাহিত্যে যে কয়েকজন লেখকের হাতে সাহিত্যজগতে নতুন এক বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ মে (১৩১৫ বঙ্গাব্দের ৬ জ্যৈষ্ঠ) বিহারের সাওতাল পরগনা,বর্তমান ঝাড়খন্ড রাজ্যের দুমকা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে। জন্মপত্রিকায় তাঁর নাম রাখা হয়েছিলো অধরচন্দ্র। তাঁর পিতার দেওয়া নাম ছিলো প্রবোধকুমার আর ডাকনাম মানিক। তাঁর পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা নীরদাসুন্দরী দেবী। চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অষ্টম। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তদানীন্তন ঢাকা জেলার সেটেলমেন্ট বিভাগের সাব-রেজিস্টার। পিতার বদলির চাকরির সূত্রে মানিকের শৈশব-কৈশোর ও ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়েছে বাংলা-বিহার-ওড়িষার দুমকা, আরা, সাসারাম, কলকাতা, বারাসাত, বাঁকুড়া,

তমলুক,কাঁথি,মহিষাদল,গুইগাদা,শালবনি,নন্দীগ্রাম,ব্রাহ্মণবাড়িয়া,টাঙ্গাইল প্রভৃতি শহরে। তার মা নীরদাসুন্দরীর আদিনিবাস ছিলো পূর্ববঙ্গের গাউদিয়া গ্রামে। এই গ্রামটির পটভূমি তিনি রচনা করেন তার প্রসিদ্ধ উপন্যাস পুতুলনাচের ইতিকথা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিলো মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা,শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম,নিয়তিবাদ ইত্যাদি।ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ ও মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রাম তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যা তাঁর রচনায় ফুটে উঠেছে। জীবনের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে তিনি রচনা করেন চল্লিশটি উপন্যাস ও তিনশত ছোটোগল্প। তাঁর রচিত পুতুলনাচের ইতিকথা,দিবারাত্রির কাব্য,পদ্মা নদীর মাঝি ইত্যাদি উপন্যাস ও অতসীমামী, প্রাগৈতিহাসিক, ছোটবকুলপুরের যাত্রী ইত্যাদি গল্পসংকলন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। ইংরেজি ছাড়াও তার রচনাসমূহ বহু বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় এবং ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে বাঁকুড়া ওয়েসলিয় মিশন কলেজ থেকে আই.এস.সি. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। কলেজ ক্যান্টিনে একদিন আড্ডা দেওয়া অবস্থায় এক বন্ধুর সাথে মানিক বাজী ধরেন তিনি তার লেখা গল্প বিচিত্রায় ছাপাবেন। সে সময় কলকাতায় বিচিত্রা পত্রিকা ছিলো অত্যন্ত বিখ্যাত এবং কেবল নামকরা লেখকেরাই তাতে লিখতেন। বন্ধুর সাথে বাজি ধরে মানিক লিখে ফেললেন তার প্রথম গল্প “অতসী মামী” এবং সেটি বিচিত্রার সম্পাদক বরাবর পাঠিয়ে দেন। গল্পের শেষে নাম সাক্ষর করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাবে। সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় লেখাটি পাঠানোর চার মাস পর বিচিত্রায় ছাপেন। প্রকাশের সাথে সাথেই গল্পটি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি পরিচিত হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে।

১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে কমলা দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এ সময় থেকে তার লেখায় কম্যুনিজমের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৯৪৬ সালে প্রগতি লেখক সংঘের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের দাঙ্গা-বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।

পিতার বদলির চাকরির সূত্রে মানিকের শৈশব-কৈশোর ও ছাত্রজীবন অতিবাহিত হয়েছে বাংলা-বিহার-ওড়িষার দুমকা, আরা, সাসারাম, কলকাতা, বারাসাত, বাঁকুড়া, তমলুক, কাঁথি, মহিষাদল, গুইগাদা, শালবনি, নন্দীগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল প্রভৃতি শহরে। তাঁর মা নীরদাসুন্দরীর আদিনিবাস ছিলো তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) গাউদিগ্রা গ্রামে। এই গ্রামটির পটভূমি তিনি রচনা করেন তাঁর প্রসিদ্ধ উপন্যাস পুতুলনাচের ইতিকথা। চাকরি সূত্রেই তার পিতা সাঁওতাল পরগনার দুমকায় গমন করেন। সেখানেই মানিকের জন্ম হয়েছিলো কিন্তু পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণের কারণে ঐ সকল মানুষের জীবনচিত্র সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা ছিলো মানিকের। তাই ঐ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনচিত্রকে তাঁর সাহিত্যে অপূর্ব দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। বিচিত্র সব মানুষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন লেখক। তাঁর এই সকল অভিজ্ঞতাকেই তিনি তাঁর সাহিত্যে তুলে ধরেছেন বিচিত্র সব চরিত্রের আড়ালে। পদ্মার তীরবর্তী জেলেপাড়ার পটভূমিতে রচনা করেন পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একজন কথাসাহিত্যিকও বটে। শেষপর্যন্ত তিনি মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স পাস করেন। পরে বাঁকুড়া ওয়েসলিয়ন মিশন কলেজ থেকে আইএসসি (১৯২৮) পাস করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএসসি-তে ভর্তি (১৯২৮) হন, কিন্তু পাঠ অসমাপ্ত রেখেই পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপন করা থেকে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সহোদরের সঙ্গে যৌথভাবে ‘উদয়াচল প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউস’ পরিচালনা করেন। একইসঙ্গে তিনি বঙ্গশ্রী (১৯৩৭-৩৯) পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। এছাড়া কিছুদিন তিনি ভারত সরকারের ন্যাশনাল ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়াল অরগানাইজার এবং বেঙ্গল দপ্তরে প্রচার সহকারী পদেও কর্মরত ছিলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ত্রিশোত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের একজন শক্তিমান লেখক।

১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য হন এবং আমৃত্যু এই দলের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। সাহিত্যের মাধ্যমে মাক্সের শ্রেণিসংগ্রামতত্ত্বের বিশ্লেষণ এবং মানুষের মনোরহস্যের জটিলতা উন্মোচনে তিনি ছিলেন একজন দক্ষশিল্পী।শহরের পাশাপাশি গ্রামজীবনের দ্বন্দ্বসঙ্কুল পটভূমিও তাঁর উপন্যাস ও গল্পে গুরুত্ব পেয়েছে। পদ্মানদীর মাঝি ও পুতুলনাচের ইতিকথা উপন্যাস দুটি তাঁর বিখ্যাত রচনা। এ দুটির মাধ্যমেই তিনি সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পদ্মানদীর মাঝি চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রচনায় মানুষের অন্তর্জীবন ও মনোলোক বিশ্লেষণে শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রথম দিকের রচনায় নিপুণভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে মানুষের অবচেতন মনের নিগূঢ় রহস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তর পরবর্তী রচনায় তাঁর সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা নাগরিক জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে তাঁর নিখুঁত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তাঁর এ পর্যায়ের রচনায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়েছেন, তা সত্ত্বেও তিনি সাহিত্যচর্চাকেই পেশা হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন। এক সময় তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর জন্য সাহিত্যিক বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।

বর্ষার মাঝামাঝি ইলিশ ধরার মওসুমে রাত্রিকালীন পদ্মার রূপ চিত্রনে লেখক সংকেতময় উপমা মন্ডিত ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন। লেখকের দৃষ্টিতে নদীর বুকে শত শত জেলে নৌকা আলো জোনাকীর মত ঘুরে বেড়ায়। অন্ধকারের মধ্যে আলো দুর্বোদ্ধ। রাতে সারা পৃথিবী যখন নিদ্রামগ্ন তখন আলোগুলো থাকে অনির্বাপিত। এই আলোতে ইলিশের নিষ্পলক চোখগুলো হয়ে ওঠে স্বচ্ছ নিলাভ মনি সদৃশ্য। রাত্রিকালের জেলে নৌকার এই বর্ণনা ছাড়া লেখক উপন্যাসের একাধিক স্থানে পদ্মার রূপ অংকন করেছেন।পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটি মানিক বন্দোপাধ্যায়ের আধুনিক বাংলা উপন্যাসের একটি বিশিষ্ট সংযোজন। জীবন জীবিকার তাগিদে পদ্মানদীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত মানুষের জীবন কাহিনী।

বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মূহুর্তে বাংলা কথা-সাহিত্যে যে কয়েকজন লেখকের হাতে সাহিত্যজগতে নতুন এক বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিলো মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি। তাঁর লেখা গল্প ও উপন্যাসগুলি বিচিত্রা, বঙ্গশ্রী, পূর্বাশা, দেশ, যুগান্তর, আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হতে শুরু করে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী। কোন সৌন্দর্য ছাড়াই রূঢ় বাস্তবকে তিনি গল্পে রূপায়িত করতেন। পূর্ববঙ্গের গ্রাম্য জীবন ও সমাজের ভন্ডামি নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’, মধ্যবিত্ত সমাজকে নিয়ে লেখা ‘দিবা-রাত্রির কাব্য’ এবং মাঝিদের জীবন অবলম্বনে রচিত তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘পদ্মানদীর মাঝি’ বাংলা সাহিত্যের অমর সম্পদ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে বস্তুবাদের প্রভাব লক্ষ্যণীয়। মনুষ্যত্ব ও মানবতাবাদের জয়গানই তাঁর সাহিত্যের মুল উপজীব্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ভাঙ্গা গড়ার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবকে তিনি তার সাহিত্যে চিত্রায়িত করেছেন। সমাজের শাসক ও পুঁজিপতিদের হাতে দরিদ্র সমাজের শোষণবঞ্চনার স্বরূপ তুলে ধরেছেন সাহিত্যের দিকে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দারিদ্র্যের প্রতিটি রেখাকে যেন কলমের ডগায় তিনি সুস্পষ্ট করে তুলতে পারতেন। পদ্মানদীর মাঝি’র কুবের-গণেশ-মালা কিংবা প্রাগৈতিহাসিকের ভিখু-পাঁচী, দারিদ্র্যের সে ভয়াল রূপ পাঠকদেরকে এতটুকু স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের লেখনী, জীবনকে সুন্দর মোড়কে মুড়িয়ে নিয়ে উপস্থাপন করে না, বরং সত্যিটাকে তার আসল চেহারায় দেখাতে চায় সবার চোখে আঙুল দিয়ে। হয়তো সে কারণেই তার কলমে উঠে এসেছিলো, “ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।”

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনে দারুন অর্থকষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন। শেষের দিকে তিনি তাঁর লেখা ছাপাবার জন্য অনেক প্রকাশকদের দরজায় ঘুরে বেরিয়েছেন। পয়সা না থাকায় কখনো শুকনো মুড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। ভাঙা টেবলে চেয়ারে বসে রাত দিন লিখে গিয়েছেন। একটাই আশা ভালো লেখা জমা দিতে পারলে পারিশ্রমিক পাবেন তাহলে সংসারের ডাল-ভাত যোগার করতে পারবেন। রাতদিন লেখায় মনোনিবেশ করে নিজের শরীরের দিকে খেয়াল করতেই ভুলে গিয়েছিলেন। না খাওয়া, রাত দিন জাগা, পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ানো ও অত্যধিক পরিশ্রমে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

জীবনকাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে উপন্যাসিক জেলেদের যে অনবদ্য চিত্র অংকন করেছেন তা যেমন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তেমনি এই ঔপন্যাসে মানুষের হৃদয় বৃত্তির যে বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে তাও পাঠকের মনকে দারুণভাবে নাড়া দিয়ে যায়। বাংলাদেশের সমাজ জীবনে নিম্ন শ্রেণির গ্রামীণ মানুষের বাস্তব চিত্র এখানে নিখুঁত ভাবে রূপায়িত হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসটি বাংলাদেশের পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়ের জীবন চিত্র। জেলে ও মাঝিদের দুঃসাহসিক জীবনযাত্রা এই উপন্যাসের উপজীব্য। পদ্মার সংগ্রামী জীবনের সাথে জেলেদের যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক তাতে তাদের আনন্দ নেই, নেই স্বপ্ন, নেই চাওয়া পাওয়া। আছে সীমাহীন বেদনা ভার। প্রাণন্তর পরিশ্রম করেও সেই পরিশ্রমের ফসল তারা ভোগ করতে পারেনা।ভোগ করে মহাজন। উপোষ কাপসে তাদের দিন কাটে। পদ্মানদীর মাঝি জেলেদের জীবন দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত। জেলে পাড়ার ঘরে ঘরে শিশুদের ক্রন্দন কোনদিন থামে না।

‘অতসী মামী’ গল্পের মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যাঙ্গনে যাত্রা। পরবর্তীকালে তিনি ‘প্রাগৈতিহাসিক’‘সরীসৃপ’ ‘হারাধনের নাতজামাই’ ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ ‘ফেরিওয়ালা’ ‘বৌ’ ‘সমুদ্রের স্বাদ’-এর মতো জীবন-সমৃদ্ধ শিল্পসার্থক গল্প লিখলেন। তার এই সফলতা ও সার্থকতার কারণ রয়েছে। তার অভিজ্ঞতার পসরা ছিলো বিচিত্র ও বিস্তৃীর্ণ। মধ্যবিত্ত অভিযাত্রিক সচেতনতার মধ্যে জন্ম বর্জিত হলেও বিত্তের অসচ্ছলতার চাপ শিল্পীকে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতেই হয়েছে প্রায় আগাগোড়া।এককথায় মানবিক বিশ্বাসের মূলে চিড় ধরেছিলো। আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মানব সত্যের প্রাণ ও স্বপ্নপুরুষ।

গ্রামের ব্রা‎হ্মণ শ্রেণির লোকেরা অত্যন্ত ঘৃণাভরে জেলেদের পায়ে ঠেলে। কালবৈশাখী ঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য বার বার আঘাত হানে। বর্ষার পানি অবাধে তাদের ঘরে ঢুকে পড়ে। নিজেদের অস্বিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তারা নিজেদের রেশারেশি এবং হানাহানিতে মেতে থাকে। তারা সকল ধর্মের চেয়ে এক বড় অধর্ম পালন করে তার নাম দারিদ্র্য। এখানে যারা বাস করে তাদের জন্য স্রষ্টার বিন্দুমাত্র করুণা নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে জেলেদের জীবনের এই বেদনাঘন দিকটি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

এই সময়ের সাহিত্য অঙ্গনের দিকে তাকালে একটি কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা একদমই অসম্ভব, ‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না আসে।’ শুধু এই সময় না শতাব্দী ধরে কথাটি এক ধরনের অসহায়ত্ব আর দীর্ঘশ্বাস হয়ে ঘুরছে আমাদের পরিচিত জগতে। বাংলা সাহিত্যের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ানো একজন সাহিত্যবোদ্ধাও এই কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন কারণ তিনি বাংলা সাহিত্যকে উচ্চাসনে নিয়ে গেলেও শেষ জীবন কাটিয়েছেন দারুণ অর্থকষ্টে। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত তার লেখনীতে বিশাল বিস্তীর্ণ নদ-নদীর পটভূমিকায় সাধারণ মানুষের কথা যেমন বস্তুনিষ্ঠ জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন,তেমনি মানুষের কর্মে পিপাসায় জীবনচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে আদিমতার অন্ধকারে ফিরে গেছেন বার বার। অদ্ভুত নিরাসক্তভাবে তিনি মানুষের জীবন ও সমস্যাকে দেখেছেন, সমাধানের চেষ্টাও করেছেন বুদ্ধি ও লেখনীতে। নর-নারীর জৈবসত্তা বিকাশের নানাদিক তাঁকে আকৃষ্ট করেছিলো।তাঁর লেখায় জৈবসত্তা ও দৈহিক বর্ণনায় ছিলেন কিছুটা বেপরোয়া প্রকৃতির। দৈহিকভাবে অসুস্থ হলেও মানসিকভাবে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বলিষ্ঠতা রক্তের উষ্ণ-স্রোত উত্তাপ টের পাওয়া যায় তার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের বর্ণনায়,পেশায়, কাজে-কর্মে।

এক জীবনে মানুষের অসামান্য হওয়ার জন্য যত গুণ থাকা দরকার মানিক বন্দোপাধ্যায়ের জীবনে সেই সব গুণাবলীই বিদ্যমান ছিলো। মানিক বন্দোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্যের মাধ্যমে সব সময় সাধারণ মানুষের জীবন তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মূলত মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের বাস্তবতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম নিয়েই তিনি বেশি লিখতেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন অভিজ্ঞতা ছিলো অনেক গভীর। ফলে জীবনকে দেখার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো আলাদা। জীবনকে দেখতেন পরিপূর্ণভাবে। জীবনের ছোট ছোট অংশগুলো একত্রিত করে তাঁর মধ্যে তিনি পূর্ণতা খুঁজতেন।

বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হচ্ছেন লেখকদের লেখক। মানিকের সৃজনীশক্তির সমগ্রতা এখনো আমাদের আলোড়িত করে। যৌন-সর্বস্ববাদ থেকে শ্রেণি-জাগরণ সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি অত্যন্ত বিস্তৃত ও প্রখর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের

‘প্রাগৈতিহাসিক’,‘চোর’,‘যাত্রা’,‘প্রকৃতি, ‘ফাঁসি’ -এই ৫টি ছোট গল্প নিয়ে এই সঙ্কলন,যা ভিন্ন আস্বাদে আগ্রহী পাঠকের প্রিয় হবে নিঃসন্দেহে। গল্পগুলোতে প্রাত্যহিক জীবনের নানান ঘটনাকে দার্শনিকের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত সরল ভাষায় বর্ণনা করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন অভিজ্ঞতা ছিলো ব্যাপক ও গভীর। ফলে তিনি জীবনের দিকটি দেখতেন তার সমগ্রতায়, খন্ড খন্ড করে নয়, অখন্ডত। এটি তাঁর প্রধান গুণ এবং লেখক মাত্রেই শ্রেষ্ঠ গুণ। তিনি যেমন ফ্রয়েডীয় মতবাদে প্রভাবিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি জীবনের, মনুষ্য জীবনের মুক্তি দেখেছিলেন মার্কসবাদে। মার্কসবাদই তাঁকে দীক্ষা দেয়। এই মতবাদেই তিনি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যে বিশ্বাস পোষণ করেন, তাই তাঁর সাহিত্য জীবনের পাথেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের মুখে এসেছিলেন, তখন থেকেই বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবনে সার্বিক অবক্ষয়ের চেতনা চারপাশ হতে ঘিরে চেপে বসতে চাইছিলো। বিশ্বজোড়া মধ্যবিত্ত বৈমানসিকতা বোধের তাড়নায় বাংলা সাহিত্য তখন পীড়িত। পাঠকের অভিজ্ঞতাতেও এ নিয়ে তারতম্য ছিলো না। তবু তাঁর অন্তরের আকাক্সক্ষা ছিলো অন্ধকারের নিরবচ্ছিন্নতাকে উতরিয়ে উত্তরণের পথ খোঁজার। সে জন্যই তিনি চিরস্মরণীয় ও বরণীয়।

বাংলা কথাসাহিত্যে অনন্য নাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ত্রিশোত্তর কালের একজন শক্তিমান লেখক। কালকে অতিক্রম করে কালজয়ী কথাশিল্পীর পরিচয়ে তিনি সমধিক খ্যাত। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে লেখক মৃগী রোগে আক্রান্ত ছিলেন যা পরবর্তী কালে জটিল অবস্থায় গমন করে। জীবনের শেষদিকে তীব্র আর্থিক কষ্টে ভুগেছেন তিনি। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর ৩ ডিসেম্বর,১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু ঘটে।

লেখকঃ সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,সভাপতি শারীরিক শিক্ষাবিদ সমিতি,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,গবেষক,সাংবাদিক ও কলামিস্ট