স্বপ্নের মতো কি কোনদিন হবে না আমার দেশ?

 

—— ডা: সিরাজুল ইসলাম আন্নু
ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে অন লাইনে ফরম্ ফিল-আপ করে পরের দিন সকাল বেলা চলে গেলাম আগারগাঁও। রাস্তায় কোন যানজট নাই। অফিসের সামনের রাস্তাটা পরিষ্কার। গাড়ীগুলো সারিবদ্ধভাবে পার্কিং করা। লাইনে দাঁড়ালাম, আমার সামনে মাত্র দশজন। মিনিট বিশেকের মধ্যে কাউন্টারে পৌঁছলাম। শুভ সকাল বলে প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র অফিসারকে দিলাম। আমাকেও শুভ সকাল বলে কাগজগুলো দেখে হাত বাড়িয়ে করমর্দণ করে বললেন “চার তলায় ৪০৭ রুমে যান।” হাসিমুখে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলাম চারতলায়।

দশ মিনিট অপেক্ষা করতেই আমার ডাক পড়লো। আমার মেয়ে বয়সী সুন্দরী অফিসার আমাকে সালাম দিয়ে মার্জিত ভাষায় বললেন “ক্যামেরার সামনে বসুন।” তিনি কম্পিউটারে প্রয়োজনীয় ইনপুট দিয়ে এসে আমার মাথা একটু সোজা করে দিয়ে বললেন “হাসি হাসি ভাব রাখুন।” ক্লিক, ক্লিক, চারবার ক্যামেরার সাটারের শব্দ পেলাম। আমাকে ডেকে বললেন “কোন ছবিটা আপনার ভালো লাগছে।” আমি বললাম “আপনার কাছে কোনটা ভালো লাগে?” “আমার কাছে চারটি ভালো লাগছে,” মেয়েটি বললো। তা’হলে “চারটে ছবি দিয়েই পাসপোর্ট করে দিন” বললাম। দু’জনেই হেসে দিলাম। হাসি বিনিময়ের পর বললেন “আগামী মাসের তিন তারিখ এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন।”

কিছুদিন পর বাসায় পুলিশ। মাথায় বিভিন্ন প্রশ্ন আসে কোথায় কি অন্যায় করেছি। তবুও তাকে বসতে দিয়ে বললাম “কেমন আছেন?” “আল্লাহ ভালো রেখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ!” তার উত্তর। হালকা নাস্তা খাওয়ার পর বললেন “স্যার আপনার বাড়ী সিঙ্গাইর। পিতা সাহাবুদ্দিন আহমেদ।” আরও কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের পর বললেন সে পু্লিশি ভেরিফিকেশনে এসেছেন। প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে নিলেন। হাসিমুখে করমর্দনে বিদায় নিলেন।

যথাসময়ে আমি পাসপোর্ট হাতে পেয়ে গেলাম। কি ঝলমলে চেহারার মেসিন রিডেবল পাসপোর্ট। ভিতরে ছবিটা চমৎকার। তথ্যগুলো নির্ভুল। বিভিন্নভাবে নেড়ে-চেড়ে দেখি আমার পরিচয়ের দলিল। বিভিন্ন পাতায় বাংলাদেশের কিছু দর্শণীয় ঐতিয্যের ছবি। সবচেয়ে ভালো লাগলো আমাদের জাতীয় সঙ্গীত লেখা দেখে। আমি চারটে লাইন জোড়ে জোড়ে গেয়ে ফেললাম।

বহুদিনের শখ সুন্দর একটা দেশে ঘুরতে যাবো। সিদ্ধান্ত নিলাম সিঙ্গাইরের নামের সাথে যে দেশের নামের মিল আছে সেই দেশে যাবো। সিঙ্গাপুর যাবো। স্ত্রী-সন্তান সহ চারটে টিকিট করলাম কোন ঝামেলা ছাড়া। রাত্রে রওয়ানা দিয়ে সকালে পৌঁছলাম সিঙ্গাপুর। মানুষজন কি স্মার্ট। কি অমায়িক ব্যবহার। ইমিগ্রেশন পার হলাম। বাহিরে মাইক্রোবাসে উঠবো এমন সময় একজন করমর্দন করে বললেন ‘হ্যাভ এ নাইস ডে।’সুন্দর একটা হোটেলে বুকিং দেয়া ছিলো। মাইক্রো হোটেলে পৌঁছে দিলো। যথারীতি আনুসঙ্গীকতা শেষ করে কক্ষে গেলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে, স্নান শেষে নীচে নামলাম। ফুড সেন্টারে নাস্তা করে সেন্টোসাতে ঘুরতে গেলাম।

মনোরেলে চড়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভাস্কর্য্য দেখলাম। তারপর আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ল্ড। মানুষজন দাঁড়িয়ে থাকে, পায়ের তলায় পাটাতন নিজেই ঘুরে ঘুরে কতো রকমের সামুদ্রীক মাছ চোখের সামনে নিয়ে আসে। ধরতে চাইলেও ধরা যায় না। সবকিছু কেন যেন দ্রুত ঘটে যাচ্ছে। মেরিনা বিচ শেষ করে বার্ড পার্কে পাখি দেখছি। কতো প্রজাতির পাখি। মানুষজন খুব সুশৃঙ্খল ভাবে উপভোগ করছে। বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঘোরা প্রায় শেষ করছি হঠাৎ গায়ে সামান্য ধাক্কা অনুভব করলাম। ঘুম ভাংগলে তাকিয়ে দেখি আমার স্ত্রী। “তাড়াডাড়ী রেডি হও। আটটা বাজে। তোমার হাসপাতালের সময় হয়ে যাচ্ছে।” ধাতস্থ হবার পর দেখলাম সব কিছুই আগের মতো। স্বপ্নের মতো কি কোনদিন হবেনা আমার দেশ?