হযরত হুদ (আ.) ছিলেন একটি দুর্ধর্ষ ও শক্তিশালী আদ জাতির জন্য আল্লাহর প্রেরিত নবী

 

মো. আলতাফ হোসেন ঃঃ
হযরত হুদ (আ.) ছিলেন হযরত নূহ (আ.)-এরই বংশধর। আদ জাতি ও ছামূদ জাতি ছিলো হযরত নূহ (আ.)-এর পরবর্তী বংশধর এবং নূহের পঞ্চম অথবা অষ্টম অধস্তন পুরুষ। ইরামপুত্র ‘আদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ঊলা’ বা প্রথম ‘আদ এবং অপর পুত্রের সন্তান ছামূদ-এর বংশধরগণ ‘আদ ছানী বা দ্বিতীয় ‘আদ বলে খ্যাত।‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রই ইরাম এর দু’টি শাখা। সেকারণ ‘ইরাম’ কথাটি ‘আদ ও ছামূদ উভয় গোত্রের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এজন্য কোরআনে কোথাও ‘আদ ঊলা’ (নাজম ৫০) এবং কোথাও ‘ইরাম যাতিল ‘ইমাদ’ (ফজর ৭) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আদ সম্প্রদায়ের ১৩টি পরিবার বা গোত্র ছিলো। আম্মান থেকে শুরু করে হাযারামাউত ও ইয়েমেন পর্যন্ত তাদের বসতি ছিলো। উল্লেখ্য যে, নূহের প্লাবনের পরে এরাই সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা শুরু করে।
হযরত নূহ (আ.) এর পর হুদ (আ.)এর আগমন হয়। হযরত হুদ (আ.) একজন নবী। ইসলামের মূল ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনে তাঁর অনেক বর্ণনা রয়েছে। কোরআন-এর ১১তম সূরা হুদ তাঁর নামে নির্দশন করা হয়। পবিত্র কোরআনের বর্ণনা থেকেও বোঝা যায়, নূহ (আ.) এর পর হুদ (আ.) এর জাতির মাধ্যমে পৃথিবীতে নতুন সভ্যতার বিকাশ হয়। আল্লাহ বলেন,‘তোমরা স্মরণ করো,যখন নুহের পর তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিলো।’ (সূরা : আরাফ, আয়াত : ৬৯)
আল্লাহ তা’য়ালা হযরত হুদ (আ.)-কে এ আদ জাতির হেদায়েতের জন্য তাদের নিকট নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। হযরত হুদ (আঃ) ছিলেন আদ বংশীয় লোক। আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে একথা উল্লেখ করেন। তিনি কওমকে যখন হেদায়েতের দাওয়াত দিলেন তখন তারা নবীর কথা শুনে ঠাট্টা বিদ্রুপ আরম্ভ করে দিলো। তারা নবীকে বললো, তুমি আল্লাহর বিশেষ দূত হিসেবে আমাদের হেদায়েত করতে এসেছ তার প্রমান কি? যদি তুমি নবী হও তাহলে উপযুক্ত প্রমান দাও। নবী তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির মুক্তি ও কল্যাণের নিমিত্তে যুগে যুগে নবী রাসূলদেরকে প্রেরণ করে থাকেন। তাঁদের কাজে ও কথায় কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ থাকে না। আল্লাহ তা’য়ালার প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করাই তাঁদের প্রধান কর্তব্য। যখন কোন কওম নৈতিকতা ও ধর্মের ক্ষেত্রে অমনোযোগী হয়ে পড়ে এবং চরম উশৃংখলতার অনুসারী হয় তখন সে কওম ও জাতির পথের দিশা হিসেবে নবীগণের আবির্ভাব ঘটে। তখন জাতি তার প্রতি আত্মস্মার্পণ করে দ্বীনে হক কবুল করলে আল্লাহ জাতিকে নাজাত দেন। তাঁদের তারাক্কিদান করেন। আর যদি তারা নবীর নাফরমান হিসেবে জীবন-যাপন শুরু করে তবে তাঁদের প্রতি আল্লাহর প্রকাশ্য গজব অবতীর্ণ হয়। অতএব তোমরা যদি স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান আন এবং দেবদেবীর পূজা-অর্চনা ছেড়ে দাও তাহলে তোমাদের সর্বত্র মঙ্গল হবে, না হয় তোমাদের উপর কঠিন আজাব আসবে, যাতে তোমরা ধ্বংস হবে। তোমাদের কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে অবশিষ্ট থাকবে না। কওমে আদ নবীর নছিহত শুনে বলত আসুক আজাব, আমরা সে আযাবের ভয় করি না। আমরা শরীরে শক্তি রাখি। আযাবের মোকাবেলা করার শক্তি আমাদের আছে। তবুও আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষের ধর্ম পরিত্যাগ করব না। আমরা এসব দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করে অনেক উপকার পেয়েছি,ধন সম্পদ ও স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়েছি। আমাদের জন্য নতুন ধর্ম গ্রহণ করা কোনক্রমে সম্ভব নয়।
হযরত হুদ (আ.) এর জাতির নাম ছিলো আ’দ। এটি আরবের প্রাথমিক যুগের একটি জাতি। বনী আদ গোত্রকে “আমালিকা” গোত্রও বলা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক দুই হাজার বছর আগে ইয়েমেনের হাজরামাউত অঞ্চলে তাদের বসবাস ছিলো বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। দীর্ঘাকৃতি, দৈহিক শক্তি ও পাথর ছেদনশিল্পে তাদের বিশেষ খ্যাতি ছিলো। কালক্রমে তারা কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও মূর্তি পূজার লিপ্ত হয়ে পড়ে। দৈহিক শক্তির কারণেও তারা বিভিন্ন অত্যাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতায় লিপ্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ হুদ (আ.)-কে তাদের উদ্দেশ্যে পাঠান, হযরত হুদ (আ.) দুর্ধষ ও শক্তিশালী ‘আদ জাতির প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ-এর পরে কওমে ‘আদ ছিলো দ্বিতীয় জাতি। হুদ (আ.) ছিলেন এদেরই বংশধর। ‘আদ সম্প্রদায়ের ১৩টি পরিবার বা গোত্র ছিলো। আম্মান হতে শুরু করে হাযারামাউত ও ইয়ামন পর্যন্ত তাদের বসতি ছিলো। তাদের ক্ষেত-খামারগুলো ছিলো অত্যন্ত সজীব ও শস্যশ্যামল। তাদের প্রায় সব ধরনের বাগ-বাগিচা ছিলো। তারা ছিলো সুঠামদেহী ও বিরাট বপু সম্পন্ন। আল্লাহ তা‘য়ালা তাদের প্রতি অনুগ্রহের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন কিন্তু বক্রবুদ্ধির কারণে এসব নে‘মতই তাদের কাল হয়ে দাঁড়ালো। তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়েছিলো ও অন্যকে পথভ্রষ্ট করেছিলো। তারা শক্তি মদমত্ত হয়ে ‘আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে’ (ফুছছিলাত/হামীম সাজদাহ ১৫) বলে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে শুরু করেছিলো।তারা আল্লাহর ইবাদত পরিত্যাগ করে হযরত নূহ (আ.)-এর আমলে ফেলে আসা মূর্তিপূজার শিরক-এর পুনরায় প্রচলন ঘটালো। মাত্র কয়েক পুরুষ আগে ঘটে যাওয়া নূহের সর্বগ্রাসী প্লাবনের কথা তারা বেমালুম ভুলে গেলো। ফলে আল্লাহ পাক তাদের হেদায়াতের জন্য তাদেরই মধ্য হতে হুদ (আ.)-কে নবী হিসাবে প্রেরণ করলেন। উল্লেখ্য যে, নূহের প্লাবনের পরে এরাই সর্বপ্রথম মূর্তিপূজা শুরু করে। হযরত হুদ (আ.) ও কওমে ‘আদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের ১৭টি সূরায় ৭৩টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এ জাতিটির নিদর্শনাবলী দুনিয়ার বুক থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কিন্তু দক্ষিণ আরবের কোথাও কোথাও এখনো কিছু পুরাতন ধ্বংস স্তুপ দেখা যায়। সেগুলোকে আদ জাতির নিদর্শন মনে করা হয়ে থাকে। হাজরা মাউতে এক জায়গায় হযরত হুদ (আ.) এর নামে একটি কবরও পরিচিত লাভ করেছে। ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জেমস আর উয়েল্লেস্টেড নামক একজন ইংরেজ নৌ-সেনাপতি ‘হিসনে গুরাবে’ একটি পুরাতন ফলকের সন্ধান লাভ করেন এতে হযরত হুদ (আ.) এর উল্লেখ রয়েছে। এ ফলকে উৎকীর্ণ লিপি থেকে পরিষ্কার জানা যায়,এটি হযরত হুদ (আ.)এর শরীয়াতের অনুসারীদের লেখা ফলক” ইবনে ইসহাকে বর্ণনা অনুসারে আদ কওমের আবাস ভুমি ওমান থেকে ইয়ামান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আর কোরআন মজীদ আমাদের বলছে,তাদের আদি বাসস্থান ছিলো আল-আহক্বাফ। এখান থেকে বেরিয়ে তারা আশেপাশের দেশসমূহে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং দুর্বল জাতিসমূহকে গ্রাস করে ফেলেছিলো। বর্তমান কাল পর্যন্ত দক্ষিণ আরবের অধিবাসীদের মধ্যে একথা ছড়িয়ে আছে যে,এ এলাকাই ছিলো আদ জাতির আবাস ভূমি।
আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ-এর পরে কওমে ‘আদ ছিলো দ্বিতীয় জাতি। আদ-এর অমার্জনীয় পাপের ফলে প্রাথমিক গজব হিসাবে তিন বছর বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত সমূহ শুষ্ক বালুকাময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগ-বাগিচা জ্বলে-পুড়ে যায়। এতেও তারা শিরক ও মূর্তিপূজা ত্যাগ করেনি কিন্তু অবশেষে তারা বাধ্য হয়ে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে। তখন আসমানে সাদা,কালো ও লাল মেঘ দেখা দেয় এবং গায়েবী আওয়ায আসে যে,”তোমরা কোনটি পছন্দ করো?” লোকেরা বললো কালো মেঘ। তখন কালো মেঘ এলো। লোকেরা তাকে স্বাগত জানিয়ে বললো,”এটি আমাদের বৃষ্টি দেবে”। ফলে অবশেষে পরদিন ভোরে আল্লাহর চূড়ান্ত গযব নেমে আসে। সাত রাত্রি ও আট দিন ব্যাপী অনবরত ঝড়-তুফান বইতে থাকে(সূরাঃ আল হাক্বকাহ: ৬-৭)।
আল্লাহ তা’য়ালা যতগুলো জাতিকে গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন তার মধ্যে আদ জাতি অন্যতম। আদ জাতি ছিলো জাঁকালো সভ্যতার অধিকারি দুর্ধর্ষ,শক্তিশালী এবং একই সাথে সম্পদশালী। তারা লম্বায় ছিলো যে কারো চেয়ে বেশি,তাদের ছিলো পেশীবহুল শরীর,তাদের হাড়ের গড়ন ছিলো যে কারো চেয়ে শক্ত,এককথায় তারা ছিলো অনন্য-তাদের সময়ে তাদের সাথে তুলনা করার মতো আর কেউ ছিলোনা। হযরত ইবন আব্বাস (রা:) ও মুকাতিল (র.)থেকে একটি (ঈসরাইলি) বর্ণনায় রয়েছে,তাদের উচ্চতা ছিলো ১৮ ফুট অর্থাৎ ১২ হাত।পবিত্র কোরআনে তাদের স্বাতন্ত্র্য অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছে,এমন দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী জাতি ইতিপূর্বে পৃথিবীতে সৃজিত হয়নি। তারা ছিলো ধ্বংসাত্মক মানসিকতার। তারা যাদের উপর আক্রমণ করত তাদেরকে ধ্বংস করে ফেলতো। তাদের ছিলো বিশাল সৈন্যবাহিনী।এতোই বিশাল যে সৈন্যবাহিনীর সামনের অংশ বিপক্ষদলকে যখন আক্রমণ করতো পেছনের অংশ তখনো শহরের গেইট পার হতে পারতো না। হযরত হুদ (আ.) ছিলেন এই জাতির জন্য আল্লাহর প্রেরিত নবী।
আদ জাতির মোট লোকসংখ্যা ছিলো এক লক্ষ। মাত্র ৭০ জন মানুষ নবীর অনুসারী হয়েছিলো। তারা নবীর কাছে আরজ করলো হে আল্লাহর নবী! দেশব্যাপী যে হারে দুর্ভিক্ষ হচ্ছে তাতে আমরা ও আমাদের আপনজনেরা কেও রেহাই পাবোনা। অতএব, আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, আল্লাহ যেনো গজব উঠিয়ে নেয়। আমরা আবার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো সবাইকে আল্লাহর পথে আনার। নবী দোয়া করলেন। বৃষ্টি হলো। আবার ফসল উৎপাদিত হলো। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো এবং স্বচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে লাগলো। নবী আবার তাদের দাওয়াত দিলে তারা পরিস্কার বলে দেয় তারা কোনদিনই দাওয়াত কবুল করবেনা। বার বার নবী দাওয়াত পেশ করেন এবং আযাবের ভয় দেখান কিন্তু তারা ঈমান আনলোনা। বরং তারা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। নবী তাদের আচার আচরণ দেখে আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। আল্লাহর তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হলো,হে নবী আপনি আপনার ৭০ জন উম্মতকে নিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে যান এবং পাহাড়ে আশ্রয় নিন। আমি অতি শীঘ্রই তাদের উপর ঝড় ও বন্যার আযাব প্রেরণ করছি। নবী তাঁর কওমকে সতর্ক করলে তারা মোটেও কর্ণপাত করলনা। তারা বললো,হে হুদ (আ.) তোমার আল্লাহ ঝড় ও বন্যার আযাব পাঠিয়ে আমাদের দূর্বল করতে পারবেনা। আমরা আমাদের কৌশল ঠিক করে রেখেছি। বরং তুমি যদি আমাদের আযাব থেকে রেহাই পেতে চাও তাহলে তোমার নবুয়তির দাবী ত্যাগ করে আমাদের মাঝে বসবাস করো,না হয় অতি সত্তর শহর ত্যাগ করো। আগামী দিন যেনো তোমাদেরকে আর এই শহরে না দেখি। নবী তাঁর উম্মতদের নিয়ে শহর ত্যাগ করলেন,দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি এলাকায় পৌছেন এবং গুহায় ঢুকে আশ্রয় নেন। অতপর মহান আল্লাহ তা’য়ালা ফেরেস্তাদের আদেশ দিলেন ঝড়ের সামান্য নমুনা আদ জাতির উপর প্রেরণ করার জন্য। আদ জাতি ঝড় দেখে খুশি হলো,তারা ভাবলো তাদের দেবতা তাদের উপর খুশি হয়ে বৃষ্টি দিচ্ছে, হযরত হুদ (আ.) গোত্র ত্যাগ করায় তাদের দেবতা খুশি হয়ে তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করছে। বৃষ্টির শুরুতে তারা তাদের গৃহে অবস্থান নিলো কিন্তু ঝড়ের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে তারা পলায়ন করলো এবং পাহাড়ে আশ্রয় নিলো। টানা আট দিন ঝড়-ঝঞ্চা চললো। এমন ঝড় এই পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি।তারা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের মাঝখানে রেখে চারদিকে বেরিকেড দিলো কিন্তু ঝড় কাওকেই রেহাই দিলো না। সুউচ্চ দালান-কোঠা,বাড়ি ঘর,মানুষের লাশ এখানে সেখানে পরে থাকলো। পুরো জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। বর্তমানে এই এলাকাটি আরব মানচিত্রে রবউলখালি বা জনশূন্য ভুখন্ড নামে পরিচিত। জনমানবহীন মরুপ্রান্তর আজও আদ জাতির নাফরমানির সাক্ষি হিসেবে পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান।
হযরত আয়েশা (রা.) বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মেঘ বা ঝড় দেখতেন, তখন তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেতো এবং বলতেন হে আয়েশা! এই মেঘ ও তার মধ্যকার ঝঞ্ঝাবায়ু দিয়েই একটি সম্প্রদায়কে ধ্বংস করা হয়েছে। যারা মেঘ দেখে খুশী হয়ে বলেছিলো,‘এটি আমাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষণ করবে। বুখারী ও মুসলিম,মিশকাত হা/১৫১৩ ‘সালাত’ অধ্যায়,‘ঝঞ্ঝা-বায়ু’ অনুচ্ছেদ রাসূলের এই ভয়ের তাৎপর্য ছিলো এই যে,কিছু লোকের অন্যায়ের কারণে সকলের ওপর এই ব্যাপক গজব নেমে আসতে পারে। যেমন ওহোদ যুদ্ধের দিন কয়েকজনের ভুলের কারণে সকলের উপর বিপদ নেমে আসে। যেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন,‘আর তোমরা ঐসব ফেৎনা থেকে বেঁচে থাক,যা বিশেষভাবে কেবল তাদের উপর পতিত হবে না,যারা তোমাদের মধ্যে যালেম। আর জেনে রাখো যে,আল্লাহর শাস্তি অত্যন্ত কঠোর’(আনফাল ৮/২৫)।
কোরআনের বর্ণনা মতে,আদ জাতিটির আবাসস্থল ছিলো‘আহকাফ’ এলাকা। এ এলাকাটি হিজায,ইয়ামন ও ইয়ামামার মধ্যবর্তী ‘রাবয়ুল খালী’র দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। এখান থেকে অগ্রসর হয়ে তারা ইয়ামনের পশ্চিম সমুদ্রোপকূল এবং ওমান ও হাজরা মাউত থেকে ইরাক পর্যন্ত নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিস্তৃত করেছিলো।
আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত বিশ্বের প্রধান ছয়টি জাতির মধ্যে নূহের পরেই হুদের জাতি আদ ছিলো। উল্লেখ্য যে,গজব নাযিলের প্রাক্কালেই আল্লাহ স্বীয় নবী হযরত হুদ (আ.) ও তাঁর ঈমানদার সাথীদের উক্ত এলাকা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দেন ও তাঁরা উক্ত আযাব থেকে রক্ষা পান (হুদ ১১/৫৮)। অতঃপর তিনি মক্কায় চলে যান ও সেখানেই ওফাত পান। তবে ইবনে কাসীর হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে,হযরত হুদ (আ.) ইয়ামনেই কবরস্থ হয়েছেন। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত। (তাফসীর ইবনে কাসীর,সূরা আরাফ,আয়াত-৬৫)।
নবী-রাসূলরা আল্লাহর মনোনীত ও প্রেরিত পুরুষ। পৃথিবীর বুকে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতিষ্ঠা ও তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য আল্লাহ তাঁদের নির্বাচিত করেছেন। পৃথিবীতে আল্লাহ তা’য়ালা অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের ভেতর ২৫ জনের নাম পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে। নবী রাসূলদের মধ্যে ১৮ জনের নাম সূরা আনআমের ৮৩ থেকে ৮৬ নম্বর আয়াতে একত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং বাকিদের নাম অন্যত্র এসেছে। সকল নবী রাসূলের দাওয়াতের মুল বিষয় তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। অনুকুল প্রতিকূল সর্বাবস্থায় দ্বীনে হকের উপর অবিচল থেকেছে ইসলামের প্রত্যেক নবী। নবীগণ ছিলেন মহান আল্লাহর পুত পবিত্র দূত। তাঁরা দিকভ্রান্ত মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। বলে দিয়েছেন অনন্ত জান্নাতের পথ। হযরত হুদ (আ.) ৪০০ বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১০০ বছর ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম ছিলো।

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট