বাড়ছে জনসংখ্যা কমছে মানুষ

 

মো.আলতাফ হোসেন ঃঃ
মানবজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন কী হতে পারে? প্রভূত অর্থ-সম্পত্তির মালিক হওয়া? বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ছড়িয়ে পড়া? কঠিনতম স্বপ্নগুলোও পূরণ করতে পারা? এগুলোর কোনোটির গুরুত্বই কম নয় কিন্তু আমরা যেহেতু মানুষ,তাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনটি হলো একজন ‘ভালো মানুষ’ হয়ে ওঠা। অর্থাৎ এমন একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা,যার নিজের ব্যাপারে মনে কোনো খোদ থাকবে না, আবার অন্যরাও নির্দ্বিধায় বলে দেবে,”হ্যাঁ,তুমি একজন ভালো মানুষ কিন্তু কীভাবে হওয়া যায় একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ? কিংবা সত্যিকারের ভালো মানুষ হওয়া কি আদৌ সম্ভব? অনেকেরই হয়তো মনে হতে পারে, না, আজকের দিনে আর পরিপূর্ণ ভালো মানুষ হওয়া সম্ভব নয়, ভালো মানুষ হয়ে এই সমাজ সংসারে টিকে থাকা অসম্ভব কিন্তু না, ভালো মানুষ হওয়া অতটাও কঠিন কিছু নয়। চাইলেই হয়ে ওঠা যায় একজন ভালো মানুষ। কোন কোন বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের মধ্যে ধারণ করলে একজন ভালো মানুষ,কিংবা নিজেরপক্ষে পূর্বাপেক্ষা শ্রেয়তর একজন মানুষে পরিণত করা যায় নিজেকে। সে বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে নিজেকে।

আমরা নিজেদের উন্নত ও সভ্যসমাজের নাগরিক দাবি করি।সময়ের ব্যবধানে আমাদের জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন হয়েছে। খাদ্য,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা,চিকিৎসা রুচিসহ সব কিছুতেই ছোঁয়া লেগেছে আধুনিকতার। স্বাধীনতা লাভের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা আট কোটি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৮ কোটির অধিক। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় মাত্র চারটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও বর্তমানে পাবলিক ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় তা দেড় শতাধিক! দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে,যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি সাধন হয়েছে; পরিবর্তন ঘটেনি শুধু মনুষ্যত্বের। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আক্ষেপ করে বলেছিলেন,‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য সাড়ে সাত কোটি কম্বল আনলাম, কিন্তু আমার কম্বল কই? সবাই পায় সোনার খনি,আমি পেলাম চোরের খনি।’সত্যিই যেনো তাই! স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও আমরা নৈতিকতার প্রশ্নে উত্তীর্ণ হতে পারিনি।

দেশের মানুষের নীতি-নৈতিকতা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যেও ধ্বস নেমেছে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশ আজ চরম সঙ্কটে। কাজ হারানো,অসহায় ও দুস্থ হতদরিদ্রদের জন্য সরকার ত্রাণ সহায়তা পাঠাচ্ছে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে কিন্তু আমাদের দেশের কিছু মানুষের নৈতিকতা এতটা নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে,অসহায়,দুস্থদের ত্রাণসামগ্রী পর্যন্ত আত্মসাৎ করে নিচ্ছেন। দুস্থ ও বিধবাদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত নিয়মিত যে ভাতা আসে,তাও গো-গ্রাস করেছেন অনেকে।

দেশের ব্যবসায়ী সমাজও নীতিহীন। প্রতি বছর রোজা এলেই বাড়তে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। এ ছাড়াও সিন্ডিকেট করে মাঝে মধ্যেই চাল,তেল,চিনি,পেঁয়াজসহ বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য লাগামহীনভাবে বাড়ানো হয়।খাদ্যে ভেজাল এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। গরিব-মিসকিনদের অধিকার কোরবানির পশুর চামড়া নিয়েও সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হতে হয়েছে দেশের মানুষকে কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস বলছে,এসব সিন্ডিকেট অজানা কোনো কারণে বিচারের আওতামুক্ত থেকে যায়। ফলে একই অপরাধ ঘটতে থাকে বারবার। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর খাদ্যে ভেজাল ও বাজার তদারকির কাজ করে থাকলেও তা অপ্রতুল। লোকবল ঘাটতি এবং অদৃশ্য চাপের মুখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না সরকারি এই সংস্থাগুলো। দেশের বুকে সত্যি সৎ ও নীতিবান মানুষের সংখ্যা কম। তাই বলা যায় বাড়ছে জনসংখ্যা,কমছে মানুষ।

বর্তমান বিভিন্ন অফিসগুলোর অবস্থা আরো করুণ। সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি আর বিড়ম্বনার শিকার হননি এমন ব্যক্তিকে ‘অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে’। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই এ দেশে যেনো গতি পায় না। অন্য দিকে, দেশের চাকরি ব্যবস্থায় আর্থিক লেনদেন প্রায় সামাজিক স্বীকৃতি পেতে বসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, আমরা যা বলি তা করি না, যা করি তা বলি না। তার এই উক্তি আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। সমাজে যে নেতা দিনের বেলায় বক্তৃতার মঞ্চে গরিব,দুঃখী,মেহনতি মানুষের জন্য গগনবিদারী আর্তনাদ করেন, রাতের আঁধারে তিনিই ত্রাণসামগ্রী এদিকে সেদিক করার পাঁয়তারা করে থাকেন। যে ছাত্রনেতা মাদক আর যৌনহয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার,মিছিল শেষে একটু মাদক সেবন না করলে তার নিজেরই স্বস্তি মেলে না। আর রাতে নারীদের উত্ত্যক্ত না করলে ঘুম আসে না। এভাবে রাষ্ট্রের প্রায় সর্বত্রই যেন অনিয়ম নিয়মে পরিণত হয়েছে। যতদিন আমাদের দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার সুষ্ঠু পরিকল্পনা তৈরি করা না হবে, যতদিন সব মতাদর্শের মানুষ জাতীয় ঐক্য গড়ে না তুলতে পারবে,সমাজ বদলের জন্য নতুন শ্লোগানের প্রচলন না করবে, দেশ এক মরীচিকার পেছনে ছুটে চলবে। তাহলে জনসংখ্যা ক্রমেই বাড়বে, কিন্তু প্রকৃত মানুষ বাড়বে না; ফলে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়নও সম্ভব হবে না।

আমাদের সমাজে এহেন পৈশাচিকতা শুধু কি ছোট অটোরিকশা চালকের প্রতি বড় দানবরা একাই ঘটাচ্ছে? আর কেউ কি প্রতিনিয়ত দুর্বলের প্রতি নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের দায়ে দোষী নই? ঘাতকের বাসটিতে তো অন্ততঃপক্ষে অর্ধশত যাত্রীও ছিলো। এদের মধ্যে একজনও কি সিএনজি ধাক্কা,তর্কাতর্কি,আধা কিলোমিটার টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে পারেনি? প্রকাশ্য রাজপথের হাজারো মানুষ কি এই বর্বরতার পরিসমাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলো? সব কৃতকর্ম সমাপ্তির পরই কেন পাষন্ড বাসচালককে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলো? প্রতিটি অবিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানুষগুলো আজ কেন এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে? এ জন্যই কি দুর্বৃত্তরা আজ এতটা বেপরোয়া? অযথা ঝামেলার মধ্যে নিজেকে না জড়িয়ে মুখ বন্ধ করে রাখার এই নবসংস্কৃতি বুমেরাং হয়ে না একসময় আমাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে! প্রিয় বাংলাদেশ আজ কেন ক্রমাগত অমানুষের জনপদে ধাবিত হচ্ছে? দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত কিন্তু ভালো মানুষের সংখ্যা কেনো দিন দিন এভাবে কমে যাচ্ছে?

দেশে আইনের শাসন আজ পুরোপুরিই কি বিপর্যস্ত? ক্ষমতার দাপট আর পেশিশক্তির কল্যাণে অপরাধীরা আইনের শাসনকে যখন নিজেরাই শাসন করতে থাকে তখনই বিপর্যয় ঘটে মানবতার। আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন,‘‘যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে,তখন ন্যায়পরায়ণের সাথে করবে।(সূরা-আন্-নিসা; আয়াত-৫৮)’’ আল্লাহ তা’য়ালা আরো এরশাদ করেন,‘‘প্রত্যেকে নিজ নিজ কর্মের জন্য দায়ী, একজনের পাপের বোঝা অপর জনে বহন করবে না। (সূরা-আল-আন্-আম;আয়াত-১৬৪)’’। তিনি আরো এরশাদ করেন,‘‘আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভালো দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি। (সূরা-আল-আম্বিয়া;আয়াত-৩৫)’’ নীতিবোধ নিয়ে কথা বলা সমাজে যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় নৈতিকতা তখন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। অন্যায়কে তোষামোদ আর চাটুকারিতা যখন বৈষয়িক উন্নতির একমাত্র নির্ধায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, মানুষের মধ্যে তখন ন্যায়-অন্যায়ের বিভেদটা খুবই সূক্ষ্ম হয়ে দাঁড়ায়। সমাজের মধ্যে বর্বর হায়েনারা তখন পঙ্গপালের মতো হিংস্র হয়ে বেড়ে উঠে ক্ষমতার তর্জনী বেয়ে। মাতৃগর্ভে থাকা শিশুকে পর্যন্ত গুলি করে তারা সমাজকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মাতৃগর্ভ পর্যন্ত এখন আর তাদের হাতে নিরাপদ নয়। মানুষ দেখছে পেশিশক্তি দিয়ে আর নির্যাতন করে নিজেকে বিজয়ী করাটা সম্ভব। শক্তিপ্রয়োগ করেও যখন বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বিলীন হয়ে যায় তখনই সমাজে এরকম সব নারকীয়তার জন্ম হয়। অপরাধীরা অপরাধ করে চলছে একের পর এক। করে যাচ্ছে রাষ্ট্রের বিরোধী। তবে মনে রাখতে হবে যে, আইনের হাত অনেক লম্বা। অপরাধীরা কেউ রেহাই পায় না আইনের হাত থেকে। আইন রাজা-বাদশা,ধনী-গবির সকলের জন্যই সমান।

বর্তমান আধুনিক বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার অনুপাতে কমছে মানুষের সংখ্যা। বর্তমান পৃথিবীতে ৭০০ কোটির উপরে জনসংখ্যা হলেও মানুষের সংখ্যা কিন্তু এতো বেশি নয়। কথায় আছে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব কিন্তু পৃথিবীতে এখন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হার নিম্নগামী। মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের থেকে অনেকগুণ বেশি গতিতে বেড়ে চলেছে জনসংখ্যা। একসময় শোনা যেত দক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের সম্পদ কিন্তু বর্তমানে অদক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় কথাটির প্রচলন বেশি শোনা যাচ্ছে। আর আধুনিক মানুষের সংস্কৃতির ক্রমাগত পরিবর্তনের গল্পগুলো লেখা হচ্ছে ইতিহাসে।

পৃথিবীতে যে গতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ব্যাস্তানুপাতিক হারে মানবতা লোপ পাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হতে পারে তার মানে কি মানুষ আর জনসংখ্যা আলাদা? প্রশ্নটি যেনো সকলের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্নের উত্তরটিও একরকম জটিল। কারণ পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা অনেক কম,তবে জনসংখ্যা ঢের বেশি। আধুনিক মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণির প্রথম আবির্ভাব ঘটে প্রায় ২৫ লক্ষ বছর আগে। এর আগে মানুষ সাধারণ প্রাণির মতোই জীবন যাপন করে এসেছে কিন্তু বর্তমানে বুদ্ধিদীপ্ত আধুনিক মানুষই সমাজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মানুষের জ্ঞানের ভান্ডার পূর্ণ হলেও বিবেক শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। কেউ জানে না মানবজাতির গন্তব্য কী।

এই পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রাণী রয়েছে। গরুর বাচ্চা গরু হয়,ছাগলের পেট থেকে হলে ছাগল হয়ে যায়,মুরগীর হলে মুরগীর বাচ্চা হয়ে যায় কিন্তু মানুষের পেট থেকে হলে মানুষ হয়ে যায়না,এইটাকে মানুষ করতে হয়,মানুষ বানাতে হয়,আমরা খালি চোখে যা দেখি সবাই মানুষ না,এইটা জনসংখ্যা।পৃথিবীতে কমে গেছে মানুষের সংখ্যা। জনসংখ্যা ৭০০ কোটি ৮০০ কোটি হলেও মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না। মানব হয়েছে দানব-কমছে মানুষ। হারিয়ে ফেলছে মানুষের মনুষ্যত্ব।

দেশে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমছে।ফলে চলছে জনসংখ্যা বোনাসের যুগ। প্রাণীজগতের মধ্যে একটি সফল ও সভ্য জাতি হচ্ছে মানুষ। আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই কিন্তু আমরা কি মানুষ হতে পেরেছি? মানুষের জীবন-যাপনের মান-ও আলাদা ও উন্নত। তাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে অবশ্যই তাকে কিছু অর্জন করতে হয় যা তাকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনে নিজের পায়ে দাড়াতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়। তার মধ্যে গড়তে হয় মুল্যবোধ,মনুষত্য ও নৈতিকতা ইত্যাদি। আর এই সবকিছু যার মধ্যে বিদ্যমান, তাকেই আমরা বলি একজন পরিপূর্ণ মানুষ।

মানুষের মতো শারীরিক গঠন হলেই তাকে মানুষ বলা হয়না। বিবেগ,বুদ্ধি যার মাঝে আছে যে সকল প্রকার ভালো মন্দ বুঝতে পারে। হালাল হারাম চিনতে পারে। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। যার দ্বারা দেশ ও দশের উন্নয়ন হবে। এমন একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারলেই আপনি মানুষের মত মানুষ হতে পারবেন। যার সুন্দর একটি মন আছে যে সব সময় সবার সাথে ভালো ব্যবহার করে। সবার মন জয় করে চলতে পারে। সেই ভালো মানুষ। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব অবিশ^াসের কিছু নেই। মানুষের মনুষ্যত্ব আছে যা অন্য কোনো প্রাণীর নেই। এই মনুষ্যত্বের জন্যই তো মানুষ অন্যান্য প্রাণীর থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সততা,ন্যায় বিচার,পরোপকার ইত্যাদি সদগুনের মাধ্যমেই মানুষ আদর্শ মানুষে পরিণত হয়। মানুষকে সদগুন অর্জনের মাধ্যমে আদর্শ মানুষের মতোই গড়ে উঠতে হবে। তবেই সে দেশ,সমাজ ও জাতির জন্য নিজের সেবাকে বিলিয়ে দিতে পারে।

মানুষের মতো মানুষ হও এই কথার মানে কিন্তু ভালো মানুষ হও এই অর্থই বোঝায়। মানুষ জন্মগতভাবে কখনোই খারাপ থাকে না। জন্মের পর পরিবেশগত কারণে বা অন্য কোনো বাস্তব কারণে খারাপের পথে অগ্রসর হয়। তবো সব মানুষের ভেতরেই একটি পবিত্র সত্ত্বা রয়েছে। পৃথিবীটিতে অনেক খারাপ কাজের মাঝে নিজেকে ভালো রাখাও অনেক কঠিন একটি কাজ। বিশ্বের প্রতিটি ধর্মগ্রন্থই মানুষকে সৎ ও সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার উপদেশ দিয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,‘‘প্রত্যেকের একটি দিক রয়েছে,যেদিক সে মুখ করে। অতএব তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করো। (সূরা-আল-বাকারা;আয়াত-১৪৩)’’ তিনি আরো বলেন,‘‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে।(সূরা-আত্-তাকাছুর; আয়াত-১)’’ অথচ সব জেনেও অনেকেই অসৎ ও অন্যায় পথে পা বাড়ায়। আর তাতে ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রবণতা থেকেও ক্রমে দূরে সরে যায় সেই মানুষ।

রাগ এমন একটি ঘূর্ণিঝড় যা মস্তিকের বাতি নিভিয়ে দেয়। রাগ একটি খুবই বাজে জিনিস,যা একটু একটু করে আমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়। যখন আমাদের সাথে খুব খারাপ কিছু ঘটে, যা আমাদের প্রত্যাশা ছিলো না, কিংবা যখন আমরা কারো কাছ থেকে খুব বাজে ব্যবহারের সম্মুখীন হই, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই আমরা অনেক রেগে যাই, ক্রোধান্বিত হয়ে পড়ি। রাগের মাথায় এমন কিছু একটা করে বসি,যাতে মানুষ হিসেবে নিজেরাই অনেক ছোট হয়ে যাই, এবং অনেক অনর্থক বিপদও ডেকে আনি। তাই রাগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

খুবই নেতিবাচক এই মানসিক অনুভূতি থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হলো ক্ষমাশীল হয়ে ওঠা। ক্ষমা এবং নম্রতা আত্মার যাকাত স্বরুপ। আত্মাই জান্নাত আর আত্মাই জাহান্নাম।আমার সাথে কেউ খুব বাজে কাজ করেছে? তাই আমি তার উপর মনে মনে রাগ পুষে রাখব? সুযোগ খোঁজবো তার কাজের প্রতিশোধ নেয়ার, তাকে উচিত শিক্ষা দেয়ার? এ ধরনের মানসিকতা যদি আমি পোষণ করি, তাতে আমি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করব। কেননা প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেবে, মনের যাবতীয় ইতিবাচক অনুভূতিগুলোকে অকেজো করে দেবে। তাই আমার জন্য সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কাজ হবে তার উপর প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা না করে, তাকে ক্ষমা করে দেয়া এবং এর মাধ্যমে নিজের মনকে কলুষতার হাত থেকে রক্ষা করা।

অন্যের উন্নতি বা ভালো দেখলে স্বভাবতই আমাদের অনেকের মনে একধরনের হাহাকার জেগে ওঠে। কেউ কেউ আবার সূক্ষ্ম ঈর্ষাবোধও করি। কিংবা ভাবি, “আমি যা করতে পারিনি বা হতে পারিনি, ও কীভাবে তা পারলো!” অর্থাৎ নিজেদের সাথে তুলনা করে যখন আমরা উপলব্ধি করি যে কেউ আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে, তখন আমরা মানসিক যাতনায় ভুগি, অস্থির হয়ে পড়ি।অথচ এই ধরনের হিংসা কখনোই আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। অন্য কারো ভালো দেখলেই যদি আমরা মনে মনে জ্বলে পুড়ে মরতে থাকি, তাতে করে আমাদের শুভবুদ্ধি লোপ পায়। অন্যের ভালো দেখে কষ্ট পাওয়ার পাশাপাশি নিজেরাও হীনম্মন্যতায় ভুগতে থাকি। নিজেদের কাছেই নিজেরা অনেক বেশি ছোট ও তুচ্ছ হয়ে যাই। নিজেদের জীবনকে অনেক অর্থহীন মনে হয় কিন্তু ভেবে দেখুন,অন্যের অবস্থা থেকে মনে নেতিবাচক শক্তি উৎপাদনের পরিবর্তে আমরা যদি নিজেদের যা যা ভালো আছে, সেগুলো নিয়ে ভাবতাম,সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতাম, তাহলে কি আমাদের মনে শান্তি ফিরে আসত না? আবার অন্য কেউ অনেক উন্নতি করেছে মানে তো আর এমন নয় যে আমরা কোনোদিন ওই ধরনের উন্নতি করতে পারব না। আমাদের প্রত্যেকের মাঝেই লুকিয়ে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। যারা উন্নতি করে, তারা সেই সম্ভাবনাগুলোর সদ্ব্যবহার করে। আমরাও যদি তা করতে পারি, তাহলে আমরাও পারব উন্নতির শীর্ষাসনে আরোহণ করতে। আর যদি আমাদের মনে হয় আমরা যাবতীয় চেষ্টা-চরিত্র করে যাচ্ছি তবু এখনো সফল হতে পারছি না,সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে কোথাও নিশ্চয়ই কোনো খামতি থেকে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদের উচিত হবে অন্যের ভালো দেখে কষ্ট পাওয়ার বদলে,নিজেদের মূল্যবান সময়কে কাজে লাগানো নিজেদের খামতিগুলোকে খুঁজে বের করার পেছনে। পাশাপাশি কীভাবে, কোন কোন জায়গায় আমাদের আরো বেশি শ্রম দেয়ার অবকাশ রয়েছে, সেগুলোও আমরা ভাবতে পারি। সর্বোপরি,অন্যের উন্নতি দেখে যদি আমরা ঈর্ষান্বিত বা হতাশ না হয়ে বরং নিজেরাও সেগুলো থেকে অনুপ্রেরণা খোঁজার চেষ্টা করি, তাহলে আখিরাতে লাভটা হবে আমাদেরই।

মানুষকে কষ্টদান থেকে বিরত থাকাই মূলত পরহেযগারী। অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্যেশ্যে নিজের খুশি উৎসর্গ করার নামই মনুষ্যত্ব। নিজে উন্নত হওয়ার সাথে সাথে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের অবশ্যই যোগ্য মানুষ হতে হবে। এখন কথা হচ্ছে আমি যোগ্য মানুষ বলতে আসলে কী বুঝাচ্ছি। শিক্ষিত মানুষ মানেই কী যোগ্য মানুষ? যোগ্য মানুষ হওয়ার ক্রাইটেরিয়াগুলো একটু আলাদা। যেমন একজন মানুষকে যোগ্য হতে হলে কিছু বিষয়েও তার দখল থাকতে হবে। চিন্তাশীল হও অর্থাৎ বাল্যবেলা থেকে এই পর্যন্ত যা শিখেছি বা শিখছি তার কতটুকু কাজে লাগছে? বানরের তেলমাখা বাঁশ বেঁয়ে উপড়ে উঠতে কতটুকু সময়ের দরকার হয় সেটা নির্ণয় করার প্রয়োজন আমার নেই। বাস্তব জীবনে ক’জনার সরাসরি কি উপকারে/কাজে আসতে পেরেছি? নবাব সিরাজউদ্দৌলা বাংলার কততম নবাব এবং তার মৃত্যু রহস্য জেনে কুড়িগ্রামে প্রচন্ড শীতে কাঁপতে থাকা বাচ্চার জীবনেই বা কি পরিবর্তন আসবে? আমরা যা পড়ি বা করি তার শতকরা কত ভাগ বাস্তব সরাসরি জীবনে প্রয়োগ করতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কল্পনা করতে শিখি বানর তেল মাখা বাঁশ বেঁয়ে উঠতে উঠতে পড়ে গিয়ে আমাদের ভাবায়, চিন্তা করার রসদ যোগায় আমাদের মনে। বীজগণিত,পাটিগণিত করতে গিয়ে শতবার ভুল করে করে যখন সঠিক উত্তরে পৌঁছাই তখন পেছন ফিরলেই দেখব কতো ভাবেই না সেটা সমাধান করতে চেষ্টা করেছি। এই যে বিভিন্নভাবে সমাধান করতে চেষ্টা করা এবং একসময় সফল হওয়া- এটা আমাদের বাস্তব জীবনে একটি সমস্যাকে বিভিন্নভাবে সমাধান করার চেষ্টা করার মতোই,হতাশ না হয়ে সমাধান নিশ্চিত আছে জেনে আত্মবিশ্বাসের সাথে লেগে থাকতে শেখায়।সমাজ বিজ্ঞান আমাদের মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিতা তৈরিতে সাহায্য করবে,নীতি-নৈতিকতা তৈরিতে সাহায্য করবে,একসাথে মিলেমিশে থাকতে সহায়তা করবে। সাবান তৈরির প্রক্রিয়া জানা জরুরী না,তবে সাবান কেনো জীবাণু দূর করে এটা জানা জরুরী। তাই ক্লাসে ১ম হওয়া জরুরি না কেনো পড়ছি সেটা জানা জরুরী! অর্থৎ শিক্ষা আমাদের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে শেখায়,মনুষ্যত্ব বোধ জাগ্রত হতে তাড়িত করে, সর্বপরি চিন্তাশীল করে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,‘‘যে ব্যক্তি এখানে অন্ধ সে আখিরাতেও অন্ধ এবং অধিকতর পথ ভ্রষ্ট। (সূরা-বনি ইসরাইল,আয়াত-৭২)’’ আল্লাহ তা’য়ালা আরো এরশাদ করেন,‘‘মানুষ যখন পথ চেনার জন্য চেষ্টা ও পরিশ্রম করে তখন আমি (আল্লাহ) তাদেরকে আমার পথ চিনিয়ে থাকি।’’ (সূরা-আন-কাবুত; আয়াত-৭)

সাফল্য অর্জন করা নিয়ে স্বামীজির বাণী,’সাফল্য লাভ করিতে হইলে প্রবল অধ্যবসায়,প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি থাকা চাই। অধ্যবসায়শীল সাধক বলেন,’ আমি গন্ডূষে সমুদ্র পান করিব। আমার ইচ্ছামাত্র পর্বত চূর্ণ হইয়া যাইবে।’এইরূপ তেজ,এইরূপ সংকল্প আশ্রয় করিয়া খুব দৃঢ়ভাবে সাধন কর। নিশ্চয়ই লক্ষে উপনীত হইবে।’প্রজ্ঞা উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃত্তি মানুষের দাসে পরিণত হয়। আর প্রজ্ঞা যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়,তখন মানুষ প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত হয়। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)বলেন,‘‘মানুষ বড়ই আশ্চর্যজনক ও বোকা। সে সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে স্বাস্থ্য হারায়। তারপর আবার সেই স্বাস্থ্য ফিরে পেতে সম্পদ নষ্ট করে। সে বর্তমানকে ধ্বংস করে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, আবার ভবিষ্যতে কাঁদে অতীতের কথা স্মরণ করে। সে এমনভাবে জীবন অতিবাহিত করে যে সে কখনো মরবে না কিন্তু সে এমনভাবেই মরে যেনো সে কখনো জন্মায়ই নি।’’

লেখকঃ গবেষক,সাবেক জাতীয় ক্রীড়াবিদ,
চেয়ারম্যান গ্রিন ক্লাব,মানিকগঞ্জ,সাংবাদিক ও কলামিস্ট